কলকাতার রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে সাম্প্রতিক নির্বাচনী সমীক্ষা ও বুথভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে। একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত কলকাতা পুর এলাকাতেই এবার গেরুয়া শিবিরের উত্থান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সর্বশেষ রাজনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, কলকাতা পুরনিগমের ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০২টিতে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে মাত্র ৪২টি ওয়ার্ডে।
এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে ভোটব্যাঙ্কে পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহুদিন ধরেই পাওয়া যাচ্ছিল। নাগরিক সমস্যা, দুর্নীতির অভিযোগ, সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং জাতীয় রাজনীতির প্রভাব— সব মিলিয়ে কলকাতার ভোটারদের একাংশের মনোভাবে পরিবর্তন এসেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে তৃণমূল শিবির অবশ্য এই সমীক্ষাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের একাংশের দাবি, বাস্তব ভোটের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা হবে এবং কলকাতায় এখনও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে বিজেপির ধারাবাহিক উত্থান যে রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে, তা অস্বীকার করছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
বিশেষ করে উত্তর কলকাতা, মধ্য কলকাতা এবং শহরতলির কিছু ওয়ার্ডে বিজেপির অগ্রগতি তৃণমূলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই প্রবণতা বজায় থাকে, তাহলে আগামী পুরভোট কিংবা বিধানসভা নির্বাচনে কলকাতার ফলাফল বড় চমক দিতে পারে।
কোন কোন এলাকায় বাড়ছে বিজেপির প্রভাব?
রাজনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দক্ষিণ কলকাতার তুলনায় উত্তর এবং মধ্য কলকাতার একাধিক ওয়ার্ডে বিজেপির প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত অঞ্চল, নতুন ভোটার এবং ব্যবসায়ী মহলের একাংশের মধ্যে গেরুয়া শিবিরের সমর্থন বেড়েছে বলে দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিক পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ, রাস্তার অবস্থা, জলনিকাশি সমস্যা এবং দুর্নীতির অভিযোগ— এই সমস্ত ইস্যুকে সামনে রেখেই বিজেপি শহরে নিজেদের প্রচার জোরদার করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাধিক সভা ও প্রচার কর্মসূচিও ভোটারদের উপর প্রভাব ফেলেছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের।
অন্যদিকে বিজেপি দাবি করছে, কলকাতার মানুষ ‘পরিবর্তনের পক্ষে’ মত দিচ্ছেন। দলের রাজ্য নেতৃত্বের বক্তব্য, শহরের শিক্ষিত এবং তরুণ ভোটারদের বড় অংশ এখন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র সমীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করলে ভুল হতে পারে। কারণ কলকাতার ভোট রাজনীতি বরাবরই জটিল এবং শেষ মুহূর্তের প্রচার বড় ভূমিকা নেয়।
কেন চাপে তৃণমূল? উঠে আসছে একাধিক ইস্যু
দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা পুরনিগমে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এবার একাধিক ইস্যু সামনে এনে আক্রমণ শানিয়েছে বিরোধীরা। দুর্নীতি, নিয়োগ বিতর্ক, নাগরিক পরিষেবার মান এবং স্থানীয় স্তরে ক্ষোভ— এই সমস্ত বিষয়কে কেন্দ্র করেই বিরোধী রাজনীতি তীব্র হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, শহুরে ভোটারদের একাংশ এখন উন্নয়ন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে আরও সচেতন। ফলে স্থানীয় সমস্যাগুলিও এখন ভোটের বড় ইস্যু হয়ে উঠছে। বিজেপি সেই অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, বিজেপি শুধুমাত্র প্রচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর পরিবেশ তৈরি করছে। দলের নেতাদের বক্তব্য, বাস্তবে কলকাতার উন্নয়ন, রাস্তা, আলো, জল সরবরাহ এবং নাগরিক পরিষেবায় বড় পরিবর্তন হয়েছে গত কয়েক বছরে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিরোধীদের শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল শহরের কিছু এলাকায় তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা। বিশেষ করে বুথস্তরে বিরোধীদের সক্রিয়তা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি।
কলকাতার ভোট রাজনীতিতে কি শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়?
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কলকাতার ভোট রাজনীতি ধীরে ধীরে নতুন মোড় নিচ্ছে। একসময় বামফ্রন্ট বনাম তৃণমূলের লড়াই দেখা গেলেও এখন শহরের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশ BJP বনাম Trinamool-এ সীমাবদ্ধ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী পুরভোটের আগে এই সমীকরণ আরও বদলাতে পারে। কারণ ভোটের আগে প্রার্থী নির্বাচন, জোট রাজনীতি, স্থানীয় ইস্যু এবং কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্ক— সবকিছুই চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।
একাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, শহুরে ভোটারদের মনোভাবে পরিবর্তনের বড় কারণ জাতীয় ইস্যুর প্রভাব। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনিক ইস্যুও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে কলকাতার রাজনৈতিক লড়াই এখন আরও বহুমাত্রিক।
তবে রাজনৈতিক সমীকরণ যাই হোক না কেন, আগামী দিনে কলকাতা যে রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে চলেছে, তা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কলকাতা পুরনিগমের একাধিক ওয়ার্ডে বিজেপির অগ্রগতি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও সমীক্ষা এবং বাস্তব ভোটের ফল এক নয়, তবুও এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক দলগুলির কাছে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— শহরের ভোট রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে।
আগামী দিনে তৃণমূল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে পারে কি না এবং বিজেপি এই গেরুয়া উত্থানকে ভোটে রূপান্তরিত করতে পারে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের। কলকাতার ভোটযুদ্ধ যে আরও তীব্র হতে চলেছে, তা বলাই যায়।






