” শব্দ ও মাধুর্যে শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসঙ্গীত ” — দীপক চক্রবর্তী ‘নিশান্ত’
বিশ্বকবি Rabindranath Tagore-এর “রবীন্দ্রসঙ্গীত”-এ শব্দ ও রাগের এমন অপূর্ব সমন্বয় অন্য কোনো গানে খুব কমই দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথের শব্দের শক্তি যেখানে শেষ হয়, সেখানে সঙ্গীত এসে তার অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে।
শব্দের জগৎ ও সঙ্গীতের জগতের গতি আলাদা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি গান রচনার সময় গীতিকার ও সুরকার ভিন্ন ব্যক্তি হন। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতে গীতিকারই সুরকার। সেই কারণেই তাঁর গানের সুরে এক অনন্য মাধুর্য অনুভূত হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় ২২৬২টি গান রচনা করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টিতে উপনিষদ, সংস্কৃত সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ও বাউল দর্শনের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। একইসঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা, তরানা ও ভজনের পাশাপাশি বাংলা লোকসঙ্গীত, কীর্তন, রামপ্রসাদী, এমনকি পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় ও লোকসঙ্গীতের প্রভাবও রবীন্দ্রসঙ্গীতে লক্ষ করা যায়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করেছিলেন— স্বদেশ, প্রেম, প্রকৃতি, পূজা, বিচিত্র এবং আনুষ্ঠানিক। এই বৈচিত্র্যই রবীন্দ্রসঙ্গীতকে করে তুলেছে সর্বজনীন ও কালজয়ী।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সঙ্গীতচর্চার এক সমৃদ্ধ পরিবেশ ছিল। রবীন্দ্রনাথের পিতা Debendranath Tagore এবং তাঁর বড় ভাইয়েরা নিয়মিত সঙ্গীতচর্চা করতেন। সেই সাংস্কৃতিক আবহেই ছোটবেলা থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতচেতনার বিকাশ ঘটে।

মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি “গগনের থালে রবিচন্দ্র দীপক জ্বলে” গানটি রচনা করেন, যা তাঁর প্রথম রচিত গান হিসেবে বিবেচিত। তাঁর শেষ রচিত গান “হে নূতন দেখা দিক আর বার” আজও মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়।
কবিতা ও গানের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ নাটক, প্রবন্ধ ও সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন ধারায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সঙ্গীত বিদ্যালয়ের শিক্ষার একটি অপরিহার্য পরিপূরক।
সঙ্গীতকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ একদিকে যেমন গভীরভাবে ভারতীয়, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর “দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়” গানে যেমন ইমন কল্যাণ রাগের স্পর্শ রয়েছে, তেমনই “হৃদয় আমার নাচেরে” গানে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রভাব স্পষ্ট।

একইভাবে “আকাশভরা সূর্য তারা” ও “মেঘ বলেছে যাব যাব” গানে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মানবমনের অনুভূতির এক অপূর্ব প্রকাশ দেখা যায়।
গুরুদেবের রচিত গান মানুষের সুখ, দুঃখ, প্রেম, বিরহ ও জীবনের নানা মুহূর্তে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমী ও রুচিশীল মানুষের কাছে প্রেরণা, শক্তি ও আত্মিক শান্তির উৎস।
এই কারণেই Rabindranath Tagore শুধু বিশ্বকবি নন, তিনি চিরবন্দনীয়।

লেখা – ডাঃ রূপকুমার বন্দ্যোপাধ্যা






