কলকাতার মেট্রো যাত্রীদের জন্য বড় খবর। কবি সুভাষ (নিউ গড়িয়া) মেট্রো স্টেশনে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ফের খালি ট্রেনের রিভার্সাল শুরু করার পরিকল্পনা করেছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ যাত্রী নামিয়ে দেওয়া ট্রেন শাহিদ ক্ষুদিরাম স্টেশন পর্যন্ত যাত্রী পরিষেবা চালানোর পর খালি অবস্থায় নিউ গড়িয়া পর্যন্ত গিয়ে সেখানে লাইন বদলে ফের উত্তরমুখী যাত্রা শুরু করতে পারবে। এই ব্যবস্থা চালু হলে ব্লু লাইনে ট্রেন পরিচালনার ব্যবধান কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে যাত্রীদের জন্য কবি সুভাষ স্টেশন কবে পুরোপুরি খুলবে, তার সঙ্গে জানুয়ারি ২০২৭-এর এই পরিকল্পনাকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। স্টেশনের ভাঙা অংশের পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ হতে আরও অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে বলে মেট্রো সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে প্রথম ধাপে স্টেশনে যাত্রী পরিষেবা নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে শুধুমাত্র খালি রেকের রিভার্সাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কবি সুভাষ স্টেশনে বাণিজ্যিক পরিষেবা বন্ধ রয়েছে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই থেকে। প্ল্যাটফর্মের স্তম্ভে ফাটল ধরা পড়ার পর যাত্রী নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পরিষেবা বন্ধ করা হয়। এরপর থেকে শাহিদ ক্ষুদিরামই উত্তর-দক্ষিণ মেট্রোর দক্ষিণ প্রান্তের টার্মিনাল হিসেবে কাজ করছে।
এই পরিস্থিতিতে নিউ গড়িয়ায় খালি ট্রেনের রিভার্সাল ফের চালু করা হলে ব্লু লাইনের অপারেশনাল ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সুবিধা হতে পারে। মেট্রো কর্তৃপক্ষের আশা, সব কিছু পরিকল্পনামাফিক হলে পিক আওয়ারে অতিরিক্ত কয়েকটি ট্রেন চালানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কীভাবে বদলাতে পারে ট্রেন চলাচল?

বর্তমানে উত্তরমুখী ট্রেনের যাত্রী পরিষেবার দক্ষিণ প্রান্ত শাহিদ ক্ষুদিরাম। যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর খালি ট্রেন নিউ গড়িয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেখানে ট্র্যাক পরিবর্তন করে উত্তরমুখী হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই অতিরিক্ত যাত্রার ফলে ট্রেনের রিভার্সালে কয়েক মিনিট বেশি সময় লাগে, যা ব্যস্ত সময়ে গোটা লাইনের ট্রেন চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে।
মেট্রো সূত্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নিউ গড়িয়ায় খালি ট্রেনের রিভার্সাল ব্যবস্থা আরও নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হতে পারে। শাহিদ ক্ষুদিরাম থেকে যাত্রী নামিয়ে ট্রেনটি নিউ গড়িয়ার দিকে যাবে, সেখানে ট্র্যাক বদল করবে এবং ফের শাহিদ ক্ষুদিরাম হয়ে উত্তরমুখী পরিষেবায় ফিরবে। যাত্রীবাহী ট্রেনের পরিবর্তে এই পর্যায়ে খালি রেক ব্যবহার করা হবে।
এর ফলে ট্রেনের টার্নঅ্যারাউন্ড বা দিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কিছুটা অপারেশনাল সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মেট্রো কর্তৃপক্ষের মতে, এর ফলে পিক আওয়ারে পরিষেবার সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাস্তবে ট্রেনের সংখ্যা ও সময়সূচিতে কী পরিবর্তন হবে, তা পরিষেবা চালুর পর অপারেশনাল পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে।
কেন বন্ধ হয়েছিল কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন?

কবি সুভাষ স্টেশনের সমস্যা একেবারে নতুন নয়। মেট্রো কর্তৃপক্ষের নজরে কাঠামোগত সমস্যার বিষয়টি বেশ কয়েক বছর ধরেই ছিল। ২০২৫ সালের বর্ষায় ভারী বৃষ্টির পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। প্ল্যাটফর্মের স্তম্ভে ফাটল দেখা দেওয়ার পর ২৮ জুলাই থেকে সেখানে যাত্রী পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর শুরু হয় স্টেশন পুনর্গঠনের প্রস্তুতি। বিশেষ করে ডাউন প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য কাঠামোগত অংশ ভেঙে নতুন করে তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে রেজ় অ্যান্ড রিপেয়ার বা ভেঙে পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়। মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ধ্বংসের কাজ শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ এবং নির্মাণে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
নতুন কাঠামোয় অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পাইল, নতুন কলাম এবং আরও শক্তিশালী স্ট্রাকচারাল সাপোর্ট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য একটাই—পুনর্নির্মাণের পর স্টেশনের কাঠামোগত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা।
স্টেশনটি শুধু ব্লু লাইনের দক্ষিণ প্রান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নয়। নিউ গড়িয়া ছিল মেট্রোর ব্লু লাইন, নিউ গড়িয়া-এয়ারপোর্ট করিডরের অরেঞ্জ লাইন এবং নিউ গড়িয়া সাবার্বান রেল স্টেশনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। ফলে দীর্ঘদিন পরিষেবা বন্ধ থাকায় যাত্রীদের যাতায়াতের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন এসেছে।
শাহিদ ক্ষুদিরাম থেকে নিউ গড়িয়া—কেন রিভার্সাল গুরুত্বপূর্ণ?
কবি সুভাষে যাত্রী পরিষেবা বন্ধ হওয়ার পর শাহিদ ক্ষুদিরামকে দক্ষিণের টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু স্টেশনটি মূলত টার্মিনাল হিসেবে তৈরি না হওয়ায় সেখানে রেক রিভার্সালের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো শুরু থেকেই সীমিত ছিল। এই কারণে ট্রেনের দিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় লাগছিল এবং তার প্রভাব পড়ছিল ব্লু লাইনের সামগ্রিক সময়সূচিতে।
২০২৬ সালের মে মাসে শাহিদ ক্ষুদিরামে রেক রিভার্সাল পয়েন্ট তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়। এই পরিকাঠামো চালু হওয়ার ফলে খালি ট্রেনকে নিউ গড়িয়া পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে রিভার্স করার প্রয়োজনীয়তা কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, নিউ গড়িয়ায় খালি রেকের রিভার্সাল পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা একটি আলাদা অপারেশনাল সমাধান। মেট্রো কর্তৃপক্ষ মনে করছে, নিরাপত্তা বিধি মেনে স্টেশনের পুনর্গঠন চলাকালীন এই ব্যবস্থা ট্রেন পরিচালনায় অতিরিক্ত নমনীয়তা দিতে পারে। তবে যাত্রীদের স্টেশনে ওঠানামা শুরু করার বিষয়টি পুনর্নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্লু লাইনে দীর্ঘদিন ধরে কবি সুভাষের পরিষেবা বন্ধ থাকায় ট্রেনের সময়সূচি, রেক রিভার্সাল, সিগন্যালিং এবং টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় একাধিক পরিবর্তন করতে হয়েছে। এর আগে শাহিদ ক্ষুদিরামে রিভার্সাল পয়েন্ট না থাকায় পরিষেবার উপর চাপ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে সিগন্যালিং ও টাইমটেবিল ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়।
কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনের পুনর্গঠন কলকাতার ব্লু লাইনের জন্য শুধু একটি স্টেশন মেরামতের প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ট্রেনের রিভার্সাল, সিগন্যালিং, সময়সূচি এবং দক্ষিণ কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ সংযোগ। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নিউ গড়িয়ায় খালি ট্রেনের রিভার্সাল চালুর পরিকল্পনা সেই বৃহত্তর অপারেশনাল ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তবে যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকবে পুনর্নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়ে কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক পরিষেবা কবে ফিরবে, সেই ঘোষণার দিকে। নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ এগোলে নিউ গড়িয়া ফের ব্লু লাইনের পাশাপাশি অরেঞ্জ লাইন ও রেল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারচেঞ্জ হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।




