সাত দশকের প্রথা ভেঙে এবার দিল্লির বাইরে বসল দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সিনেমার সম্মাননা মঞ্চ। গুজরাতের কেভাডিয়া, অর্থাৎ একতা নগরে সোমবার আয়োজিত হল ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে পুরস্কার নিতে হাজির হয়েছিলেন দেশের তাবড় তারকারা। কার্তিক আরিয়ান, ধনুশ, মামুট্টি, ইয়ামি গৌতমদের পাশাপাশি এই আসরে গর্বের মুহূর্ত বয়ে আনলেন বাংলার শিল্পীরাও।
সবচেয়ে বড় খবর, সেরা বাংলা চলচ্চিত্রের শিরোপা এবার উঠল পরিচালক অঞ্জন দত্তের ছবি ‘চালচিত্র এখন’-এর ঝুলিতে। দীর্ঘদিন ধরে দর্শক-সমালোচক উভয়েরই প্রশংসা কুড়িয়েছিল ছবিটি, এবার মিলল সরকারি স্বীকৃতিও।
শুধু সেরা বাংলা ছবিই নয়, শিশুশিল্পী বিভাগেও নজর কাড়ল বাংলা। সব মিলিয়ে এবারের জাতীয় পুরস্কারের আসরে সাফল্যের নিরিখে বেশ উজ্জ্বল থাকল টলিউড।
সেরা বাংলা ছবি ‘চালচিত্র এখন’, বাংলার মুকুটে নতুন পালক
অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ‘চালচিত্র এখন’ ছবিটি এবার সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্রের সম্মান ছিনিয়ে নিয়েছে। মুক্তির পর থেকেই ছবিটি নিয়ে ইতিবাচক চর্চা চলছিল টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে।
গল্প বলার আলাদা ধরন এবং অভিনয়ের জন্য প্রশংসিত হয়েছিল এই ছবি। এবার জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে সেই স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশির হাওয়া বাংলা ছবির অন্দরমহলে।
শুধু পুরস্কার প্রাপ্তিই নয়, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও বটে। জাতীয় স্তরে বাংলার গল্প বলার ক্ষমতা যে এখনও অটুট, তা আরও একবার প্রমাণিত হল এই পুরস্কারের মাধ্যমে।
শিশুশিল্পী বিভাগেও এবার জ্বলজ্বল করেছে বাংলার নাম। বাংলা ছবি ‘অঙ্ক কি কঠিন’-এর তিন খুদে শিল্পী এই বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছেন, যা গোটা বাংলা ইন্ডাস্ট্রির জন্যই এক বাড়তি প্রাপ্তি।

সেরা ছবি ও সেরা অভিনেতার শিরোপা কার হাতে?
সামগ্রিকভাবে সেরা চলচ্চিত্রের সম্মান এবার গিয়েছে আদিত্য ধর প্রযোজিত রাজনৈতিক থ্রিলার ‘আর্টিকেল ৩৭০’-র ঝুলিতে। ইয়ামি গৌতম অভিনীত এই ছবি মুক্তির পর থেকেই ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
সেরা অভিনেতার শিরোপা এবার ভাগ করে নিয়েছেন দুই তারকা। ‘চন্দু চ্যাম্পিয়ন’ ছবির জন্য কার্তিক আরিয়ান এবং মালয়ালম ছবি ‘ভ্রমযুগম’-এর জন্য দক্ষিণী মেগাস্টার মামুট্টি যৌথভাবে এই সম্মান অর্জন করেছেন।
সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার উঠেছে ইয়ামি গৌতমের হাতেই, ‘আর্টিকেল ৩৭০’ ছবিতে তাঁর অভিনয়ের জন্য। দীর্ঘদিনের অভিনয় জীবনে এটি ইয়ামির কাছে এক বিশেষ প্রাপ্তি।
এছাড়াও সেরা নবাগত পরিচালকের সম্মান পেয়েছেন রণদীপ হুডা, তাঁর পরিচালিত ‘স্বাতন্ত্র্য বীর সাভারকর’ ছবির জন্য। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণী তারকা ধনুশও, যাঁর উপস্থিতি মঞ্চের জৌলুস আরও বাড়িয়ে দেয়।

দাদাসাহেব ফালকে সম্মানে ভূষিত অনন্ত নাগ, সাত দশকের প্রথা ভাঙল
এবারের অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত ছিল দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রদান। ভারতীয় সিনেমার এই সর্বোচ্চ সম্মানে এবার ভূষিত হয়েছেন প্রবীণ ও বর্ষীয়ান অভিনেতা অনন্ত নাগ।
কয়েক দশক ধরে দক্ষিণী ও হিন্দি সিনেমায় নিজের অভিনয় প্রতিভার ছাপ রেখে চলেছেন তিনি। এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের এক যোগ্য স্বীকৃতি বলেই মনে করছেন ইন্ডাস্ট্রির অনেকে।
আরও একটি লক্ষণীয় বিষয়, স্বাধীনতার পর প্রথমবার দিল্লির বাইরে অনুষ্ঠিত হল এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। গুজরাতের একতা নগরকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই ঐতিহাসিক আয়োজনের জন্য।
মঞ্চের আয়োজন থেকে শুরু করে অতিথি তালিকা, প্রতিটি দিক দিয়েই এবারের অনুষ্ঠানকে বিশেষ করে তোলার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট। বলিউড, দক্ষিণী ও আঞ্চলিক সিনেমার তারকাদের এক ছাদের তলায় নিয়ে আসা এই আয়োজন দর্শকদের কাছেও ছিল বিশেষ আকর্ষণের।

সব মিলিয়ে ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শুধু বলিউড বা দক্ষিণী সিনেমার জন্যই নয়, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যও ছিল এক গর্বের মুহূর্ত। অঞ্জন দত্তের ‘চালচিত্র এখন’-এর হাত ধরে সেরা বাংলা ছবির শিরোপা এবং শিশুশিল্পীদের প্রাপ্তি প্রমাণ করে দিল, জাতীয় মঞ্চে বাংলা এখনও সমান শক্তিশালী।
কার্তিক আরিয়ান, মামুট্টি, ইয়ামি গৌতম থেকে অনন্ত নাগ— প্রতিটি সম্মাননাই এবারের অনুষ্ঠানকে করে তুলেছে স্মরণীয়। আর দিল্লির বাইরে প্রথমবার এই আয়োজন গোটা অনুষ্ঠানকে দিয়েছে এক ঐতিহাসিক মাত্রা।




