বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা ধর্মেন্দ্রর প্রয়াণে শিল্পী মহলে নেমে এসেছে গভীর শোক। বহু দশকের জনপ্রিয়তা, সংস্কারের ভিত গড়ার মতো অভিনয় জীবনের অবসান যেন এক যুগের সমাপ্তি। তাঁর প্রস্থানে শুধু দেবল পরিবারই নয়, সমগ্র চলচ্চিত্রজগত হারাল এক চিরকালীন নক্ষত্র।
এই কঠিন সময়ে দেবল পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুম্বইয়ের জুহুতে অবস্থিত দেবল রেসিডেন্সে পৌঁছান রণবীর কাপুর ও আলিয়া ভাট। দুজনেই ছিলেন একেবারে নিরিবিলি, গণমাধ্যমের সামনে কোনো কথা বলতে চাননি। চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল শোক, শ্রদ্ধা ও বেদনাহত আবেগ।
ধর্মেন্দ্র শুধু দেবল পরিবারের স্তম্ভই ছিলেন না; কাপুর ও ভাট পরিবারের সঙ্গেও বহু বছরের সখ্যতা ছিল তাঁর। আলিয়া ও রণবীরের এই সফর ছিল শুধুমাত্র পারিবারিক বন্ধন, মানবিকতা ও সম্মানের প্রকাশ। দুই তারকা বাড়িতে ঢোকার সময় হাত নেড়ে ক্যামেরার দিকে সম্ভাষণ জানালেও পরিস্থিতির গুরুতরতার কারণে তারা গণমাধ্যমের প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
তারকাজগতে অনেকেই ধর্মেন্দ্রকে বলিউডের ‘হৃদয়ের মানুষ’ হিসেবে দেখতেন। তাঁর আন্তরিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিল্পীজীবনের সংযম আজও বহু নবতরুণ অভিনেতার জন্য অনুকরণীয়। সেই মানুষটির বিদায়ে মুম্বই জুড়ে শোকের ছায়া ছড়িয়েছে স্বাভাবিকভাবেই।
শান্ত, সংযত রণবীর–আলিয়ার উপস্থিতি: দেবল পরিবারের পাশে থাকার বার্তা

রণবীর কাপুর ও আলিয়া ভাট এদিন পৌঁছান অত্যন্ত সাধারণ পোশাকে; রণবীর ছিলেন কালো টি-শার্ট ও ডেনিমে, আর আলিয়া শোকের প্রতীক হিসেবে সাদা-কালো কুর্তায়। তাদের আগমনেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি কোনো সেলিব্রিটি উপস্থিতি নয়—বরং একান্ত মানবিক সমবেদনার সফর।
দুজনেরই নিরাপত্তারক্ষীরা সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন দূরত্ব বজায় রাখতে, যাতে বাড়ির ভেতরের শোকাহত পরিবেশে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। শোকসন্তপ্ত সানি দেওল ও ববি দেওল এদিন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে ছিলেন; রণবীর–আলিয়ার সফর অবশ্য স্বল্প সময়ের হলেও তা পরিবারকে আবেগতাড়িত করেছে বলেই জানা গেছে ঘনিষ্ঠ সূত্রে।

বহু সময় দেখা যায়, তারকা উপস্থিতি কখনও কখনও প্রচারে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু এই সফরে তার কোনো ছায়াই ছিল না। দুজনই কোনো বক্তব্য দেননি, কোনো ‘পোজ’ দেননি—শুধু মাথা নত করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এটি বলিউডের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সুশৃঙ্খল আচরণের এক শক্তিশালী উদাহরণ বলেই অনেকে মনে করছেন।
রণবীর ও ধর্মেন্দ্রের পরিচয় বহু বছরের; কাপুর পরিবারের সঙ্গে দেওল পরিবারের সখ্যতা রয়েছে প্রজন্ম ধরে। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতাই আজকের এই নীরব শ্রদ্ধায় প্রতিফলিত হয়।
ধর্মেন্দ্র: হিন্দি সিনেমার ‘ইস্পাত-হৃদয়’ তারকা থেকে সরল মানুষের যাত্রাপথ
ধর্মেন্দ্র মানেই বলিউডের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। তাঁর ‘ইস্পাত-হৃদয়’ ভাবমূর্তি, অথচ ভেতরে স্নেহশীলতা—এই দ্বৈত গুণ তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য। শোলে, চুপকে চুপকে, আনন্দ, ধরম বীর, যমলা পাগলা দেওয়ানা—এমন বহু ছবিতে তিনি অভিনয়ের যে সামর্থ্য দেখিয়েছেন, তা বলিউডের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকবে।

তাঁর অভিনয়জীবন পাঁচ দশক পেরিয়েও অমলিন; অ্যাকশন, কমেডি, রোমান্স—প্রতিটি ধারাতেই তিনি দর্শকের প্রিয়। ‘হেমা–ধর’র প্রেমগাথা যেমন ভারতীয় সংস্কৃতিতে এক অধ্যায় হয়ে আছে, তেমনি সানি ও ববি দেওল—দেবল পরিবারের প্রতিটি প্রজন্মই তাঁর প্রভাব বয়ে চলেছে।
ব্যক্তিজীবনে ধর্মেন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত সরল, বিনয়ী এবং অতিথিপরায়ণ। নিজের বাড়ির দোরগোড়ায় আগত কেউই খালি হাতে ফেরেনি—এমন উদাহরণ বলিউডে খুব কমই শোনা যায়। তাঁর এই মানবিক গুণই তাঁকে কেবল নক্ষত্র নয়, ‘মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর প্রয়াণে শুধু পরিবারই নয়; পুরো দেশ যেন একজন প্রিয়জনকে হারাল। তাঁর মতো বৃহত্তর-হৃদয়ের অভিনেতা আর কবে দেখা মিলবে—এ প্রশ্নই এখন চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বলিউড পরিবারের একাত্মতা: তারকারা একে একে জানাচ্ছেন শোকবার্তা
ধর্মেন্দ্রর প্রয়াণে বলিউডের প্রায় প্রতিটি পরিচিত মুখই শোক ও স্মৃতিচারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভরে তুলেছেন। অমিতাভ বচ্চন থেকে শাহরুখ খান, সালমান খান থেকে অক্ষয় কুমার—সবার কাছেই ধর্মেন্দ্র ছিলেন এক ‘স্মৃতি-সমুদ্র’।
গত দুই দিনে দেবল রেসিডেন্সে পৌঁছেছেন অজয় দেবগণ, জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ, কারিনা কাপুর খান, বিকি কৌশল–ক্যাটরিনা কাইফ, অনিল কাপুর, রণদীপ হুদা সহ আরও অনেকে। তাদের মধ্যে অনেকেই পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে দীর্ঘ সময় পাশে থেকেছেন।

শোকবার্তাগুলোর মধ্যে বারবার উঠে আসছে ধর্মেন্দ্রর সহৃদয় স্বভাব ও তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একদিকে ‘মাচো হিরো’, অন্যদিকে নিখাদ পারিবারিক মানুষ। বলিউডের পুরনো থেকে নতুন—সব প্রজন্মের কাছেই তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।
তারকারা যখন এইভাবে একসঙ্গে দাঁড়ান, তখন স্পষ্ট হয় চলচ্চিত্রজগতের মানবিক দিক—যা দর্শকরা পর্দায় কমই দেখতে পান। এই সংহতি শুধুই পেশাগত সৌজন্য নয়; বরঞ্চ বহু দশকের সম্পর্ক, সম্মান ও আবেগের এক মিশ্র রূপ।
ধর্মেন্দ্রর বিদায়ে বলিউডে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিন পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর জীবন, শিল্প ও মানবিকতা বহু প্রজন্মের শিল্পীদের প্রেরণা হয়ে থাকবে।
রণবীর কাপুর ও আলিয়া ভাটের মতো তারকারা যখন শোকাহত পরিবারকে সম্মান জানাতে নীরবে এগিয়ে আসেন, তখন সেটিই প্রমাণ করে—মানবিকতা এখনো শিল্পের আসল ভিত্তি।
দেবল পরিবার বিগত কয়েক দিন ধরে অন্ত্যেষ্টি ও পারিবারিক আচার সম্পন্ন করছে। ধর্মেন্দ্রর স্মৃতি যে দেশবাসীর হৃদয়ে গভীরভাবে বেঁচে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। শিল্পীর প্রস্থান হলেও তাঁর শিল্প—চিরদিন অমলিন।






