সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধাক্কার মুখে ভারতীয় শেয়ার বাজার। মঙ্গলবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সেনসেক্সে ৩০০ পয়েন্টের বেশি পতন দেখা যায়, অন্যদিকে নিফটি৫০ নেমে যায় গুরুত্বপূর্ণ ২৩,৮০০ স্তরের নীচে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির প্রবণতা— সব মিলিয়ে বাজারে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তার আবহ।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্ব অর্থনীতির উপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন সরাসরি ভারতীয় বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বাজারের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ওপেনিং সেশনে ব্যাঙ্কিং, আইটি, অটো এবং মেটাল সেক্টরের একাধিক বড় শেয়ারে বিক্রির চাপ দেখা যায়। ফলে সূচকের উপর চাপ আরও বেড়ে যায়। বাজারের শুরুতেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে লাভ তোলার প্রবণতাও স্পষ্ট ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে অস্থিরতা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা উচিত। কারণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করেই আগামী কয়েক দিনের বাজারের দিক নির্ধারিত হতে পারে।
কেন বড় পতনের মুখে পড়ল সেনসেক্স ও নিফটি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার পতনের পিছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। তার মধ্যে অন্যতম হল আন্তর্জাতিক বাজারের দুর্বল সংকেত। আমেরিকা এবং ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ায় ভারতীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতীয় অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি করছে। ভারত যেহেতু বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে শেয়ার বাজারে।
এছাড়া বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বা FII-দের বিক্রির প্রবণতাও বাজারে চাপ বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সেশনগুলিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলে নিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং মার্কিন বন্ড ইল্ড বৃদ্ধিও উদীয়মান বাজারগুলির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন।
টেকনিক্যাল বিশ্লেষকদের মতে, নিফটি৫০-এর ২৩,৮০০ স্তর ভেঙে যাওয়া বাজারে স্বল্পমেয়াদি দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি বিক্রির চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী সেশনগুলিতে আরও অস্থিরতা দেখা যেতে পারে।
কোন কোন সেক্টরে সবচেয়ে বেশি চাপ?
ওপেনিং ট্রেডে সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গিয়েছে ব্যাঙ্কিং এবং আইটি সেক্টরে। বড় বড় প্রাইভেট ব্যাঙ্কের শেয়ারে বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাঙ্ক নিফটি সূচকও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আইটি সেক্টরেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা স্পষ্ট ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির উপর চাপ এবং মার্কিন অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলির উপরও প্রভাব ফেলছে।
অটো এবং মেটাল সেক্টরেও দুর্বলতা দেখা যায়। অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি অটো শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতির কারণে মেটাল সেক্টরেও চাপ বাড়ছে।
তবে FMCG এবং ফার্মা সেক্টরের কিছু শেয়ার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা প্রতিরক্ষামূলক সেক্টরের দিকে ঝোঁকেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েকটি ট্রেডিং সেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজার, তেলের দাম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অবস্থানের উপরই এখন বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কী করা উচিত?
বাজারে বড় পতন দেখলেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বাজারের ওঠানামা স্বাভাবিক বিষয়। বরং ভালো মানের শেয়ারে ধাপে ধাপে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবেও অনেকেই এই সময়কে দেখেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে যাঁরা স্বল্পমেয়াদি ট্রেড করছেন, তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
এছাড়া পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় রাখার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। শুধুমাত্র একটি সেক্টরের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনও শক্তিশালী। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বাজারও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সেনসেক্স এবং নিফটির সাম্প্রতিক পতন বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করলেও বিশেষজ্ঞরা এটিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব বলেই মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনও ইতিবাচক বলেই মত বিশ্লেষকদের। এখন নজর থাকবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং আগামী কয়েকটি ট্রেডিং সেশনের উপর।






