মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝেই সামনে এল এক বিস্ফোরক রিপোর্ট, যেখানে দাবি করা হয়েছে— সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় পাকিস্তান নাকি ইরানের সামরিক বিমানকে নিজেদের এয়ারবেসে রাখার অনুমতি দিয়েছিল। এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম CBS News-কে উদ্ধৃত করে একাধিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরান তাদের কিছু সামরিক বিমান পাকিস্তানের নূর খান এয়ারবেস-সহ একাধিক ঘাঁটিতে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদকে রক্ষা করা।
যদিও পাকিস্তানের তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ইসলামাবাদের দাবি, এত বড় সামরিক তৎপরতা কোনওভাবেই গোপন রাখা সম্ভব নয়, বিশেষ করে নূর খান এয়ারবেসের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছে অবস্থিত ঘাঁটিতে।
এই ঘটনাকে ঘিরে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে পাকিস্তানের ‘নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী’ ভূমিকা নিয়ে। কারণ একদিকে ইসলামাবাদ আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতা করছিল, অন্যদিকে গোপনে তেহরানকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে কি না, তা নিয়েই এখন তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
নূর খান এয়ারবেসে ইরানের সামরিক বিমান? কী দাবি রিপোর্টে
রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকা-ইরান সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ইরান তাদের কিছু সামরিক বিমান পাকিস্তানের এয়ারবেসে সরিয়ে নিয়ে যায়। মার্কিন আধিকারিকদের দাবি, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিমান এবং সামরিক প্রযুক্তিকে নিরাপদ রাখা।
বিশেষভাবে উঠে এসেছে পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের নূর খান ঘাঁটির নাম। এই ঘাঁটিটি রাওয়ালপিন্ডির কাছে অবস্থিত এবং পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সেখানে একটি ইরানি RC-130 নজরদারি বিমানও রাখা হয়েছিল।
RC-130 মূলত নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই ধরনের বিমান পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে রাখা হলে তা কেবল কূটনৈতিক নয়, নিরাপত্তা এবং সামরিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ইরান তাদের কিছু অসামরিক বিমান আফগানিস্তানেও সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। যদিও সেই বিমানের মধ্যে সামরিক সম্পদ ছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্ন উঠছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কি ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে?
পাকিস্তানের ‘ডাবল গেম’? আমেরিকায় বাড়ছে প্রশ্ন
এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর মার্কিন রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রকাশ্যে বলেছেন, রিপোর্ট সত্যি হলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়ন করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান বর্তমানে অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরান এবং ঘনিষ্ঠ মিত্র চিনের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা— এই দুইয়ের মধ্যে ইসলামাবাদকে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক খেলা খেলতে হচ্ছে।
পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা বললেও, বাস্তবে তাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতা— সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের তরফে দাবি করা হয়েছে, এই ধরনের রিপোর্ট ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইসলামাবাদের বক্তব্য, নূর খান ঘাঁটির মতো জায়গায় বিদেশি সামরিক বিমান লুকিয়ে রাখা বাস্তবে সম্ভব নয়।
তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, পাকিস্তান হয়তো প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ থেকেও আড়ালে নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতটা প্রভাব ফেলছে দক্ষিণ এশিয়ায়?
আমেরিকা-ইরান সংঘাত নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই সংঘাতের প্রভাব এখন দক্ষিণ এশিয়াতেও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিও সেই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না।
পাকিস্তান বর্তমানে একদিকে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে, অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় ইরানকে ঘিরে কোনও বিতর্কে জড়িয়ে পড়া ইসলামাবাদের জন্য নতুন সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই আঞ্চলিক শক্তিগুলির উপর চাপ বাড়বে। কারণ প্রত্যেক দেশকেই কোনও না কোনওভাবে পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।
এছাড়া চিন, রাশিয়া এবং আমেরিকার মতো বড় শক্তিগুলির ভূমিকাও আগামী দিনে এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের এয়ারবেসে ইরানের সামরিক বিমান রাখার অভিযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যদিও ইসলামাবাদ অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও এই রিপোর্ট মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আমেরিকা-ইরান সংঘাতের প্রভাব এখন যে সীমান্ত পেরিয়ে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, এই ঘটনা তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।






