ভারতীয় কনটেন্ট ইকোসিস্টেম দ্রুত বদলাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আবারও উঠে আসছেন একতা কাপুর—ভারতের টেলিভিশন বিপ্লবের স্থপতি। সংযুক্ত টিভির উত্থান, ডিজিটাল কনটেন্টের দর্শক-বদল এবং নারী-কেন্দ্রিক গল্প বলার নতুন সম্ভাবনা—সবেতেই তিনি দেখছেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
CII Big Picture Summit 2025-এ YouTube India-র ডিরেক্টর গুঞ্জন সোনির সঙ্গে এক বিশেষ ফায়ারসাইড চ্যাটে একতা কাপুর শেয়ার করলেন তাঁর অভিজ্ঞতা, দর্শন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—দর্শকের প্রাথমিক আবেগ ধরতে পারলে, ভারতীয় ঘর-সংসারের হৃদয়ও ধরা পড়ে।
শুরুতেই সোনি তাঁকে পরিচয় করান “ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী মিডিয়া ক্রিয়েটর” হিসেবে। তাঁর সাহসী যাত্রা, বাঁকবদল, সংগ্রাম এবং সাফল্য—সবই আজ ভারতীয় বিনোদন শিল্পের ইতিহাসের অংশ।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবার (জিতেন্দ্র) স্টুডিওতে কাজ শুরু করা একতা আজ ভারতের সর্বোচ্চ প্রভাবশালী গল্পবলিয়েদের একজন। কিন্তু তাঁর প্রথম বড় সুযোগ এসেছিল বহু প্রত্যাখ্যানের পর, এবং অবাক করার মতোভাবে দক্ষিণ ভারত থেকে—রাজিনীকান্তের সমর্থনে।
“মেয়েরা যে মানসিক বোঝা বইতে বাধ্য হয়, পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে ধরা হয়,”—বলতে গিয়ে কাপুর তুলে ধরলেন সেই সমাজবাস্তবতা, যেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল কিউঙ্কি সাস ভি কভি বহু থি-র মূল আবেগ। শাশুড়ি-বউমার সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন, উত্তরাধিকার, প্রত্যাশা আর আবেগ—সব মিলিয়ে একটি প্রজন্মের গল্প হয়ে উঠেছিল ‘কিউঙ্কি’।
তার ভাষায়, “Once you catch a primary emotion, you catch a home.”
নারী-নেতৃত্বাধীন গল্পের ফেরত: ডিজিটালে নতুন ঢেউ
গত কয়েক বছর ধরে OTT প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত পুরুষ-দর্শককে কেন্দ্র করে বিষয়বস্তু নির্মাণ করেছে। কারণ সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক অর্থনীতি পুরুষদের দেখার ধরণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে টেলিভিশন, যা বিজ্ঞাপনের ওপর দাঁড়িয়ে, বরাবরই নারীদের জন্য কনটেন্ট তৈরি করেছে।
কিন্তু সংযুক্ত টিভি (Connected TV) এখন প্রায় ১০ কোটি ঘর ছুঁইছুঁই। একতার মতে, এই পরিবর্তন OTT-কে আবারও নারী-নেতৃত্বাধীন, পরিবারমুখী, শহুরে-মাস দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
তিনি বলেন—
“ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো নারীদের প্রতি কিছুটা ‘অন্যায়’ করেছে। আর টেলিভিশন পুরুষ দর্শকদের ঠিক মতো পূরণ করতে পারেনি। সংযুক্ত টিভি এই দুই মেরুকরণকে ঠিক করবে।”
এই পরিবর্তনে তিনি দেখছেন নতুন ধারার জন্ম—
- মধ্যবয়সী নারীদের গল্প
- কর্মজীবন, পরিবার, সম্পর্কের বাস্তবতা
- নরম, অনুভূতিপূর্ণ রোমান্স
- ‘ভারতীয় কোরিয়ান ড্রামা’ স্টাইলের কনটেন্ট
একতার কথায়—
“আজ যেগুলোকে আমরা কোরিয়ান ড্রামা বলি, সেগুলো দশ বছর আগে ভারতে বানানো হত।”
ডিজিটাল দর্শকস্রোত আবার নারীদের চারপাশে ঘুরতে শুরু করলে নির্মাতা হিসেবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাচ্ছে। সিরিয়াল নয়, এখন তিনি দেখছেন মাল্টি-ফরম্যাট, মাল্টিপ্ল্যাটফর্ম কনটেন্টের ভবিষ্যৎ।

‘কিউঙ্কি’–র নতুন যুগ: টুলসির আধুনিক জীবন, হাসি আর অনিশ্চয়তা
ইতিহাসগড়া চরিত্র ‘টুলসি’ এখন ফেরত আসছে নতুন রূপে—আরও বাস্তব, আরও মানবিক, আরও হাস্যরসাত্মক। আধুনিক ভারতীয় নারীর চাপ, আনন্দ, অনিশ্চয়তা এবং হাসির দুনিয়াকে কেন্দ্র করেই কিউঙ্কির নতুন সিজন।
একতার বর্ণনা অনুযায়ী:
• ফিটনেস উদ্বেগের টুলসি
এক দৃশ্যে টুলসি ওজন মাপতে গিয়ে সংখ্যা দেখে চমকে ওঠে এবং বলে ওঠে—
“স্কেলটাই খারাপ!”
একতার স্বীকারোক্তি—“আমি নিজেই এটা নিয়মিত করি।”
• মায়েদের আত্মবিশ্বাসে অনিচ্ছাকৃত আঘাত
আরেক দৃশ্যে টুলসির মেয়ে বলে—“মা, তোমার ব্লাউজটা একটু টাইট।”
একতার পর্যবেক্ষণ—এই সাধারণ কথাই কত মায়ের মনে হালকা কাঁপন এনে দেয়।
“আমরা না বুঝেই অন্য কারও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিই,”—তিনি বলেন।
নতুন কিউঙ্কি তাই শুধুমাত্র ঘরোয়া নাটক নয়; এটি মধ্যপ্রজন্মের নারীর আত্মপরিচয়, পরিবারে নিজের স্থান, শরীরী-উদ্বেগ, সম্পর্কের খেলা এবং নস্টালজিয়ার সূক্ষ্ম মিশ্রণ।
একতার মতে—
“তুলসি এখন অনেক বেশি স্তরযুক্ত। তিনি আধুনিক মহিলার মতোই—দৃঢ় ও অনিশ্চিত, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মসংশয়ে ভরা।”
শিল্পে নারীর অবস্থান: “চেয়ার নেই? নিজের চেয়ার নিয়ে আসুন”
বিনোদন শিল্প—বিশেষত টেলিভিশন ও OTT—এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে পুরুষ-নেতৃত্বাধীন। এই অবস্থার কঠিন বাস্তবতা একতা কাপুর নিজেই বহুবার অনুভব করেছেন।
তিনি অকপটে বলেন—
“গল্ফ কোর্সে, ডাইনিং টেবিলে যে কথোপকথন হয়, সেখানে আমরা অনেকেই থাকি না।”
তাঁর মতে সমস্যার সমাধান দুটি পথে—
• শক্তিশালী নারী-নেটওয়ার্ক তৈরি করা
নারীরা একে অপরকে সহযোগিতা করলে শিল্পের ভিত্তি আরও শক্ত হবে।
• পুরুষদের বাদ না দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা
সমান সুযোগের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইকোসিস্টেমই শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আর নতুন প্রজন্মের নারীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা—
“টেবিলে বসার জায়গা নেই? নিজের চেয়ার নিয়ে আসুন। প্রয়োজন হলে নিজের টেবিলই তৈরি করুন।”
ঝুঁকি, ব্যর্থতা এবং নিজের অন্তর্জ্ঞান: একতার ব্যক্তিগত দর্শন
ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা একতাকে বদলে দিয়েছিল। প্রচলিত পরামর্শ মেনে যে প্রজেক্ট তিনি করেছিলেন, তা হয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবনের “সবচেয়ে বড় ফ্লপ”।
এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে—
- নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়
- ঝুঁকি না নিলে সফলতার মুখ দেখা যায় না
- সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করার সাহস থাকতে হবে
তিনি বলেন—
“আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারপর তার ফল ভোগ করতে হবে। অন্য কোনো পথ নেই।”
আজকের একতা কাপুর—বহু সফলতা ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে উঠে আসা একজন নির্মাতা—যিনি জানেন আবেগ ধরার শক্তি কত বড়। একটি প্রাথমিক আবেগ ধরতে পারলে সেটাই হয়ে ওঠে সর্বজনীন গল্প।
একতা কাপুরের মতামত স্পষ্ট—ভারতীয় গল্প বলার ভবিষ্যৎ আবারও আবেগ, পরিবার, নারী-দর্শন এবং দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম বাস্তবতার ওপর দাঁড়াতে চলেছে। সংযুক্ত টিভি OTT-কে ফিরিয়ে আনবে তাদের প্রকৃত দর্শকের কাছে। আর ‘কিউঙ্কি’—যে সিরিয়াল এক প্রজন্মকে বদলে দিয়েছিল—এবার নতুন প্রজন্মের আবেগ ছুঁতে প্রস্তুত।
“প্রাথমিক আবেগ” ধরার ক্ষমতা যদি থাকে, তবে ভারতীয় ঘর-সংসার আবারও গল্পকে নিজের করে নেবে—এই বিশ্বাসই আজও একতা কাপুরকে চালিত করে।






