সকাল সাতটা থেকে কলকাতার রাস্তায় নামলেই বোঝা যায়—এটা কেবল যাতায়াত নয়, এক ধরনের দৈনিক লড়াই। অফিস, কলেজ, স্কুল—সবকিছুর সময় ধরেই নিত্যযাত্রীর জীবন বাঁধা। অথচ সেই সময়মতো পৌঁছনোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মেট্রোর ভয়াবহ ভিড় আর বাসের অপ্রতুলতা।
মেট্রো একসময় ছিল স্বস্তির প্রতীক। আজ তা অনেকের কাছেই শ্বাসরোধকারী অভিজ্ঞতা। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা, দরজা খুলতেই হুড়োহুড়ি, ভিতরে ঢুকে জায়গা না পেয়ে ঝুলে থাকা—এই দৃশ্য এখন কলকাতার শহুরে জীবনের নিত্যদিনের ছবি।
অন্যদিকে বাস পরিষেবা, যা একসময় শহরের প্রাণ ছিল, আজ কার্যত সংকটে। রুট কমেছে, বাসের সংখ্যা কমেছে, আর যা আছে তাতে ভিড় এমন যে ওঠাই দায়। ফলে নিত্যযাত্রীদের সামনে বিকল্পও সীমিত—অটো, ক্যাব বা বাইক, যার খরচ সাধারণ মধ্যবিত্তের পক্ষে প্রতিদিন বহন করা কঠিন।
এই দুই সমস্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষ—যাদের সকাল শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি দিয়ে, আর দিন শেষ হয় ক্লান্তি আর বিরক্তি নিয়ে।
মেট্রো: স্বস্তি থেকে সংকট


কলকাতা মেট্রো ভারতের প্রথম মেট্রো পরিষেবা হিসেবে একসময় গর্বের প্রতীক ছিল। কিন্তু যাত্রীসংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, সেই অনুপাতে পরিকাঠামো বা পরিষেবা আপগ্রেড হয়নি—এটাই আজকের মূল সমস্যা।
সকাল ন’টা থেকে এগারোটা এবং সন্ধ্যা পাঁচটা থেকে আটটা—এই দুই সময় মেট্রো কার্যত যুদ্ধক্ষেত্র। এক একটি কামরায় যতজন যাত্রী থাকার কথা, তার প্রায় দ্বিগুণ মানুষ ঢুকে পড়ে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মহিলা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে, আর বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য যাত্রা হয়ে ওঠে ভয়ংকর।
নিত্যযাত্রীরা বলছেন, ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়লেও বাস্তবে তার প্রভাব খুব কম। নতুন রুট চালু হলেও পুরনো লাইনের চাপ কমেনি। বরং অফিস, আইটি সেক্টর আর বাণিজ্যিক কেন্দ্র বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণ করিডরে যাত্রীচাপ আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু ট্রেনের সংখ্যা নয়। প্ল্যাটফর্ম ম্যানেজমেন্ট, যাত্রী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প ট্রান্সপোর্টের অভাব—সব মিলিয়ে মেট্রো আজ নিজেই নিজের বোঝা বইছে।
বাসের অভাব: শহরের রক্তসঞ্চালনে ধাক্কা

মেট্রোর বিকল্প হিসেবে বাসই ছিল সাধারণ মানুষের ভরসা। কিন্তু আজ সেই বাস পরিষেবাই সংকটে। বহু পুরনো রুট বন্ধ, অনেক বেসরকারি বাস রাস্তায় নামছে না, আবার সরকারি বাসের সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় কম।
বাস না পাওয়ার ফলে যাত্রীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। অফিসে দেরি, স্কুলে বাচ্চাদের পৌঁছতে সমস্যা, আর জরুরি কাজ থাকলে তো কথাই নেই। একাধিক বাসস্টপে দেখা যায়, একটি বাস এলেই যাত্রীদের হুড়োহুড়ি—যার ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস পরিষেবা দুর্বল হলে শহরের গোটা ট্রাফিক ব্যবস্থার উপর চাপ পড়ে। মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত যান বা ক্যাব ব্যবহার করে, ফলে রাস্তায় গাড়ি বাড়ে, ট্রাফিক জ্যাম বাড়ে, দূষণ বাড়ে।
এটা শুধু যাত্রীদের সমস্যা নয়, এটা শহরের সামগ্রিক নাগরিক পরিকাঠামোর ব্যর্থতার প্রতিফলন।
নিত্যযাত্রীদের মানসিক ও আর্থিক চাপ


এই যাতায়াত সংকটের প্রভাব শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। প্রতিদিন ভিড়ের মধ্যে যাতায়াত করতে করতে অনেকেই মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছেন। অফিসে পৌঁছনোর আগেই শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে।
আর্থিক দিক থেকেও চাপ বাড়ছে। বাস বা মেট্রো না পেয়ে অটো, অ্যাপ ক্যাব বা বাইক বুক করতে হচ্ছে—যার খরচ মাস শেষে বড় অঙ্কে দাঁড়াচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
মনোবিদদের মতে, এই ধরনের দৈনিক স্ট্রেস দীর্ঘমেয়াদে কাজের দক্ষতা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অথচ এই সমস্যার কোনও তাৎক্ষণিক সমাধান চোখে পড়ছে না।
মেট্রোর ভিড় আর বাসের অভাব—এই দুই সমস্যার মাঝে আটকে আছে কলকাতার নিত্যযাত্রীরা। এটা আর সাময়িক অসুবিধা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী নাগরিক সংকট। পরিকল্পনা ছাড়া শহর বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী গণপরিবহণ ব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে না।
সমাধান শুধু নতুন লাইন বা নতুন বাস নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা—মেট্রো, বাস, অটো, সাবার্বান রেল সবকিছুকে এক সুতোয় বাঁধা। নইলে প্রতিদিনের এই যুদ্ধ আরও কঠিন হবে, আর তার সবচেয়ে বড় মূল্য চুকোবেন সাধারণ মানুষই।






