কলকাতার বুকে ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। বুধবার ভোররাতে মধ্য কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে আচমকা আগুন ছড়িয়ে পড়ে। রাত প্রায় ২টা নাগাদ আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পাঁচতলা ভবনটি। ঘুমন্ত অবস্থায় আটকে পড়েন বহু মানুষ।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে একজন চার বছরের শিশুও রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মৃতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও ছিলেন, যাঁরা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন।
আগুন লাগার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকল, কলকাতা পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সদস্যরা। ঘন কালো ধোঁয়ার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। উপরতলার ঘরগুলিতে পৌঁছতে গিয়ে দমকলকর্মীদের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। অন্তত ১৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ড ফের কলকাতার পুরনো ও ঘিঞ্জি এলাকার হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সংকীর্ণ রাস্তা, পুরনো নির্মাণ, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের অভাব এবং জরুরি নির্গমনপথের পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাত ২টায় আগুন, মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত প্রায় ২টা নাগাদ আগুনের সূত্রপাত হয়। কলকাতার নিউ মার্কেট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট সংলগ্ন ব্যস্ত এলাকায় আচমকা আগুন ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশে আতঙ্ক তৈরি হয়।
হোটেলের ভিতরে সেই সময় বহু অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুনের পাশাপাশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়াই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। অনেকেই ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে পড়েন বলে জানা গিয়েছে।
আগুনের খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকলের ইঞ্জিন। পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলের কর্মীরাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন। ভবনের ভিতরে আটকে থাকা অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য শুরু হয় তল্লাশি।
ঘন ধোঁয়ার কারণে সিঁড়ি দিয়ে উপরের তলায় পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছিল। দমকলকর্মীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হয়। উদ্ধারকাজের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করে দেখা হয় যাতে কেউ ভিতরে আটকে না থাকেন।
প্রাথমিকভাবে অন্তত ১৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ভবনের ভিতরে শুরু হয় কুলিং ও সার্চ অপারেশন।
৯ জনের মৃত্যু, মৃতদের মধ্যে শিশুও

অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হল প্রাণহানি। এখনও পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। মৃতদের মধ্যে পুরুষ, মহিলা এবং চার বছরের এক শিশুও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে মৃতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক থাকার কথা সামনে এসেছে। তাঁরা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কলকাতায় এসেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
কলকাতা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। নিউ মার্কেট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে বহু বাজেট হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে, যেখানে চিকিৎসা করাতে আসা রোগী ও তাঁদের পরিজনেরা থাকেন।
এই ঘটনার ফলে শুধু প্রাণহানিই নয়, শহরের চিকিৎসা পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হোটেলগুলির নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যে সমস্ত ভবনে পুরনো পরিকাঠামোর মধ্যে হোটেল বা গেস্টহাউস পরিচালিত হয়, সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠতে পারে।
আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। ধোঁয়া শরীরে ঢুকে যাওয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে চিকিৎসকদের তরফে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে ফের বড় প্রশ্ন

কলকাতার পুরনো ও ঘিঞ্জি এলাকাগুলিতে অগ্নিকাণ্ড নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিটি বড় আগুনের পর একই প্রশ্ন ফিরে আসে—হোটেল, গেস্টহাউস এবং বাণিজ্যিক ভবনগুলিতে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে?
একটি হোটেলে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি আলো, স্পষ্ট সিঁড়ি এবং নিরাপদ বিকল্প নির্গমনপথ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগুন লাগার সময় মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশেষ করে রাতে যখন অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে থাকেন, তখন আগুনের প্রাথমিক সতর্কতা এবং দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অনেক সময় আগুনের চেয়েও ধোঁয়াই বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই ঘটনায় ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে। শর্ট সার্কিট, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনও কারণ—কোনও সম্ভাবনাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফে ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মেনে চলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে কলকাতার অন্যান্য হোটেল ও গেস্টহাউসেও নিরাপত্তা পরিদর্শনের প্রয়োজন রয়েছে।
মধ্য কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ড আরও একবার মনে করিয়ে দিল, একটি ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কাগজে-কলমে থাকলেই যথেষ্ট নয়—জরুরি পরিস্থিতিতে তা বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেটিই আসল। নয়টি প্রাণের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই প্রশ্নকেই আরও তীব্র করে তুলেছে।
ঘটনার পূর্ণ তদন্ত, মৃতদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, আহতদের চিকিৎসা এবং অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এখন প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। একইসঙ্গে কলকাতার হোটেল ও গেস্টহাউসগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি।
এই ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে কলকাতা ও সমগ্র বাংলা।






