কলকাতা: বাবাকে খুঁজতে গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি দেয় এক ছোট্ট ছেলে। অচেনা শহর, অজানা পথ আর এক বুক প্রশ্ন নিয়ে শুরু হয় তার যাত্রা। কিন্তু যে সফরের উদ্দেশ্য ছিল হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খুঁজে পাওয়া, সেই পথই শেষ পর্যন্ত তাকে এমন এক মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, যার নিজের জীবনও নিঃসঙ্গতা, প্রতারণা এবং অপূর্ণতার গল্পে ভরা। এই অপ্রত্যাশিত সম্পর্ককেই কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে প্রতীক সরকারের নতুন বাংলা ছবি ‘C/O A Journey’।
ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন বনি সেনগুপ্ত, দর্শনা বণিক এবং তৃষাণজিৎ চৌধুরী। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক গ্রামবাংলার কিশোর এবং এক একাকী কনম্যানের অদ্ভুত বন্ধুত্ব। বয়স, জীবনযাপন কিংবা সামাজিক অবস্থান—কোনও দিক থেকেই তাঁদের মধ্যে মিল নেই। অথচ পরিস্থিতির টানে তৈরি হয় এমন এক সম্পর্ক, যা ক্রমশ হয়ে ওঠে ছবির আবেগের মূল কেন্দ্র।
‘C/O A Journey’-এর গল্প শুধু একজন বাবাকে খোঁজার কাহিনি নয়। এটি একইসঙ্গে পরিবার, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, একাকীত্ব, বিশ্বাস, বন্ধুত্ব এবং নিজের জন্য একটি ‘ঘর’ খুঁজে পাওয়ার গল্প। গ্রামবাংলার পরিচিত মাটির গন্ধ থেকে কলকাতার ব্যস্ত নগরজীবন—দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশকে পাশাপাশি রেখে মানুষের সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তনকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে ছবিটি।
প্রতীক সরকারের পরিচালনায় এই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যাবে চন্দন সেন, শিলাজিৎ মজুমদার এবং সুদীপ মুখোপাধ্যায়কেও। ফলে মূল গল্পের পাশাপাশি পার্শ্বচরিত্রগুলিও যে ছবির আবেগ ও নাটকীয়তাকে আরও গভীর করবে, সেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
বাবাকে খুঁজতে গ্রাম থেকে কলকাতার পথে এক ছোট্ট ছেলে
‘C/O A Journey’-এর গল্পের সূচনা এক শিশুর অপূর্ণতা থেকে। গ্রামের এক তরুণ ছেলে তার বাবাকে প্রায় দেখেইনি। পরিবারের বিচ্ছিন্নতা, বাবার অনুপস্থিতি এবং নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তাকে ক্রমশ অস্থির করে তোলে। একসময় সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে পাড়ি দেয় শহরের পথে।
শিশুটির কাছে কলকাতা শুধুমাত্র একটি শহর নয়। এটি তার কাছে এমন এক অজানা জায়গা, যেখানে তার বাবা কোথাও আছেন বলে সে বিশ্বাস করে। তাই পরিচিত গ্রাম, নিরাপদ পরিবেশ এবং আপনজনদের ছেড়ে তার এই যাত্রা হয়ে ওঠে আবেগের পাশাপাশি এক ধরনের আত্মঅনুসন্ধানও।

গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার এই যাত্রাপথ ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। গ্রামবাংলার সরলতা এবং কলকাতার ব্যস্ততা—দুই ভিন্ন জগতের সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে শিশুটির মানসিক পরিবর্তনও সামনে আসতে পারে। যে পৃথিবীকে সে এতদিন দূর থেকে কল্পনা করেছে, বাস্তবে সেই পৃথিবীর মুখোমুখি হওয়ার পর তার ধারণাগুলিও বদলাতে শুরু করবে।
এই যাত্রাতেই তার সঙ্গে দেখা হয় বামার। বনি সেনগুপ্ত অভিনীত এই চরিত্রটি সাধারণ নায়কসুলভ কোনও চরিত্র নয়। বরং জীবনের নানা বাঁক, একাকীত্ব এবং প্রতারণার অভিজ্ঞতায় তৈরি একজন মানুষ। পেশাগতভাবে সে একজন কনম্যান—অর্থাৎ প্রতারণার মাধ্যমে জীবন চালানো একজন ব্যক্তি। কিন্তু তার কঠিন বাইরের আবরণের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গভীর একাকীত্ব।
প্রতারক বামা ও পাটুর বন্ধুত্বই ছবির আবেগের কেন্দ্র
একজন ছোট ছেলে, অন্যদিকে জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তৈরি এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ—প্রথম দেখায় তাঁদের সম্পর্কের কোনও যৌক্তিক ভিত্তি নেই। কিন্তু ‘C/O A Journey’-এর অন্যতম আকর্ষণ এখানেই। পরিস্থিতি তাঁদের কাছাকাছি আনে এবং ধীরে ধীরে তৈরি হয় এমন একটি বন্ধন, যা প্রচলিত সম্পর্কের সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করে।
বামা হয়তো মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু পাটুর সঙ্গে তার সম্পর্ক অন্যরকম। শিশুটির সরলতা, বিশ্বাস এবং বাবাকে খুঁজে পাওয়ার অদম্য ইচ্ছা বামার নিজের জীবনের শূন্যতাকে যেন নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। যে মানুষটি অন্যদের ঠকিয়ে বেঁচে থাকতে শিখেছে, সেই মানুষই ধীরে ধীরে এক শিশুর প্রতি দায়িত্ববোধ অনুভব করতে শুরু করে।
এখানেই ছবির গল্প আরও মানবিক হয়ে ওঠে। পাটু বামার মধ্যে হয়তো এমন একজন সঙ্গী খুঁজে পায়, যে তাকে শহরের অচেনা পথে সাহায্য করতে পারে। আর বামা পাটুর মধ্যে খুঁজে পায় এমন এক নির্মল সম্পর্ক, যেখানে অর্থ, প্রতারণা কিংবা স্বার্থের কোনও জায়গা নেই।
এই বন্ধুত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল এর অসমতা। তাঁদের বয়স আলাদা, অভিজ্ঞতা আলাদা এবং পৃথিবীকে দেখার চোখও আলাদা। তবুও তাঁদের মধ্যে তৈরি হওয়া সম্পর্ক ধীরে ধীরে রক্তের সম্পর্কের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ছবির আবেগ তাই শুধু ‘বাবাকে খোঁজা’র মধ্যে আটকে নেই। বরং প্রশ্ন ওঠে—পরিবার কি শুধুই রক্তের সম্পর্ক দিয়ে তৈরি? নাকি কখনও কখনও জীবনের পথে পাওয়া কোনও অপরিচিত মানুষই হয়ে উঠতে পারেন নিজের মানুষের মতো?
এই জায়গাতেই ‘C/O A Journey’ সমকালীন বাংলা সিনেমার পরিচিত পারিবারিক গল্পের বাইরে গিয়ে আরও বিস্তৃত মানবিকতার দিকে এগিয়ে যায়। একজন মানুষ কীভাবে অন্য একজন মানুষের জীবনে আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেন, সেই ভাবনাই গল্পটির অন্যতম শক্তি।
বনি-দর্শনা জুটির পাশাপাশি শক্তিশালী পার্শ্বচরিত্র
‘C/O A Journey’-এ বনি সেনগুপ্তের বামা চরিত্র যেমন গল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, তেমনই দর্শনা বণিকও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে তৃষাণজিৎ চৌধুরীর উপস্থিতি ছবির চরিত্রগুলির মধ্যে একটি ভিন্ন ধরনের আবেগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে দর্শনা বণিকের চরিত্রটি গল্পের মূল সম্পর্কগুলির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, তা ছবির অন্যতম আগ্রহের জায়গা। তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে গল্পে সম্পর্কের আরও একটি মাত্রা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে চন্দন সেন, শিলাজিৎ মজুমদার এবং সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ অভিনেতাদের উপস্থিতি ছবির চরিত্রনির্ভর গল্প বলার ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের অভিনয় দক্ষতার জন্য পরিচিত, ফলে মূল চরিত্রগুলির যাত্রাপথে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ছবির গল্প লিখেছেন প্রতীক সরকার ও সপ্তর্ষি ঘটক। চিত্রনাট্য, স্ক্রিনপ্লে এবং সংলাপের দায়িত্বে রয়েছেন সপ্তর্ষি ঘটক ও শিনজন বসু। অর্থাৎ গল্পের ভাবনা থেকে সংলাপ নির্মাণ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সৃজনশীল দল ছবিটির আবেগকে পর্দায় তুলে ধরার দায়িত্ব নিয়েছে।
প্রযোজনার দায়িত্বে রয়েছে মহাদিগন্ত কমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্ক (MCN)। ছবির মূল ভাবনার সঙ্গে প্রযোজনার এই পরিসরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গল্পটি বাণিজ্যিক বিনোদনের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল দিক তুলে ধরতে চাইছে।
‘C/O A Journey’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এর পরিবেশ। একদিকে মাটির কাছাকাছি গ্রামবাংলা, অন্যদিকে দ্রুতগতির কলকাতা। এই দুই জগতের বৈপরীত্য শুধু ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্য তৈরির জন্য নয়, গল্পের চরিত্রগুলির মানসিক অবস্থাকেও প্রতিফলিত করবে।
গ্রাম এখানে শিকড়ের প্রতীক, আর শহর অজানার। কিন্তু গল্প যত এগোবে, এই দুইয়ের সীমারেখা ধীরে ধীরে বদলাতে পারে। পাটুর কাছে যে শহর প্রথমে বাবাকে খোঁজার জায়গা, সেটিই হয়তো পরে নতুন সম্পর্ক এবং নতুন আশ্রয়ের জায়গায় পরিণত হবে।
এখানেই ছবির নাম ‘C/O A Journey’-এর তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ঠিকানা খোঁজার যাত্রা শেষ পর্যন্ত মানুষ খোঁজার যাত্রায় পরিণত হয়। আর সেই মানুষ খোঁজার মধ্যেই হয়তো তৈরি হয় নতুন একটি ঠিকানা—যেখানে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও থাকে আপন হওয়ার অনুভূতি।
বাবা খোঁজার গল্প থেকে ‘ঘর’ খুঁজে পাওয়ার যাত্রা
অনেক সিনেমায় একটি চরিত্রের যাত্রার লক্ষ্য থাকে নির্দিষ্ট—কাউকে খুঁজে পাওয়া, কোনও রহস্যের সমাধান করা কিংবা নিজের অতীতের মুখোমুখি হওয়া। ‘C/O A Journey’ সেই পরিচিত কাঠামো ব্যবহার করেও গল্পটিকে আরও আবেগপ্রবণ জায়গায় নিয়ে যেতে চায়।
পাটু বাবাকে খুঁজতে বেরোয়। কিন্তু যাত্রার শেষে সে শুধু তার বাবাকে খুঁজে পাবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। বরং এই পথ তাকে নিজের সম্পর্কে, মানুষের সম্পর্কে এবং ‘পরিবার’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে কী শেখাবে—সেটিই হয়ে উঠতে পারে ছবির আসল বিষয়।
বামার উপস্থিতি এই যাত্রাকে আরও জটিল করে তোলে। একজন কনম্যানের জীবন সাধারণত বিশ্বাসের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে পাটুর মতো একটি শিশুর নির্মল বিশ্বাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হওয়া নিজেই একটি নাটকীয় বৈপরীত্য।
এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নিতে পারে ছবির সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলি। যে মানুষ নিজে হয়তো কোনওদিন স্থায়ী সম্পর্কের নিরাপত্তা পায়নি, সে যখন একটি শিশুর দায়িত্ব নিতে শুরু করে, তখন তার নিজের ভেতরের পরিবর্তনও দর্শকের সামনে ধরা পড়তে পারে।
পরিবার, একাকীত্ব এবং belonging—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাই ‘C/O A Journey’ একটি বৃহত্তর মানবিক গল্প হয়ে উঠতে পারে। আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া শহুরে জীবনে যেখানে মানুষ চারপাশে থেকেও অনেক সময় একা, সেখানে অপরিচিত দুজন মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া এই সম্পর্ক আলাদা মাত্রা পায়।
শেষ পর্যন্ত এই যাত্রা হয়তো কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে থামবে না। বরং দর্শককে ভাবাবে—একজন মানুষের সত্যিকারের ‘ঘর’ কোথায়? জন্মের জায়গায়, পরিবারের কাছে, নাকি এমন কারও পাশে যাঁর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়?
‘C/O A Journey’ এমন একটি বাংলা ছবি হিসেবে সামনে আসছে, যার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক শিশুর বাবাকে খোঁজার সরল ইচ্ছা এবং সেই পথে পাওয়া এক জটিল, একাকী মানুষের সঙ্গ। বনি সেনগুপ্ত, দর্শনা বণিক ও তৃষাণজিৎ চৌধুরীর পাশাপাশি অভিজ্ঞ অভিনেতাদের উপস্থিতি ছবিটিকে আরও সমৃদ্ধ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রতীক সরকারের পরিচালনায় এই ছবি গ্রামবাংলা ও কলকাতার দুই ভিন্ন পরিবেশকে ব্যবহার করে পরিবার, বন্ধুত্ব, একাকীত্ব এবং মানবিক সংযোগের গল্প বলতে চাইছে। বিশেষ করে বামা ও পাটুর অসমবয়সি বন্ধুত্ব ছবিটির আবেগের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বাবাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া একটি সফর কীভাবে শেষ পর্যন্ত নতুন এক সম্পর্কের জন্ম দেয়, সেটিই ‘C/O A Journey’-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। কারণ কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির সঙ্গে আমাদের দেখা হয় ঠিক তখনই, যখন আমরা অন্য কাউকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।






