মুম্বই বিমানবন্দরে প্রতিবারই ক্যামেরা ও মাইকের ভিড়ে বলিউড তারকাদের অস্বস্তিতে পড়তে হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছল যে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন প্রবীণ অভিনেত্রী ও সাংসদ জয়া বচ্চন। সাংবাদিকদের প্রশ্ন করা ও আচরণ নিয়ে তিনি বলতে গিয়ে মন্তব্য করেন—“নোংরা পোশাক পরে, হাতে মোবাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এরা কারা? কে সাংবাদিক, আর কে নয়, সেটা আমাকে শেখাবেন না।”
শনিবার বিকেলে মুম্বই এয়ারপোর্টে নামতেই তাঁকে ঘিরে ধরে ক্যামেরাম্যান ও তথাকথিত ‘শাউট জার্নালিস্ট’-রা। প্রশ্নের তোড়, ফ্ল্যাশের অতিরিক্ত ঝলক, আর সেলফি তোলার চেষ্টায় বিরক্ত হয়ে ওঠেন জয়া। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের আচরণ নিয়ে তাঁর ক্ষোভ থাকলেও এতটা সরাসরি প্রতিক্রিয়া খুব কমই দেখা গেছে।
জয়া বচ্চনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে তুমুল প্রতিক্রিয়া। কেউ তাঁর বক্তব্যকে যুক্তিযুক্ত বলেছেন, আবার কেউ তাঁকে ‘অতিরিক্ত রুক্ষ’ বলে সমালোচনা করেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে উঠে এসেছে বিনোদন সাংবাদিকতার নীতি, নিরাপত্তা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে খানিকটা নীরব থাকলেও, সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ইউনিটগুলিও নিজেদের দায় এড়াতে পারছে না। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘পাপারাজ্জি কালচার’ আগের চেয়ে আরও তীব্র হয়েছে, এবং সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এসেছে।
জয়া বচ্চনের ক্ষোভের পেছনে আসলে কী?

জয়া বচ্চন শুধু বলিউডের অভিজ্ঞ অভিনেত্রী নন, বহুদিন ধরে তিনি সংসদ সদস্যও। সামাজিক শালীনতা, পেশাগত নীতি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে তিনি বরাবরই খোলাখুলি কথা বলেন। তাই সাংবাদিকদের ‘পোশাক, আচরণ ও পেশাদারিত্ব’ নিয়ে তাঁর প্রশ্ন তোলা অনেকের কাছেই আশ্চর্যের নয়।
এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই নিজেকে ‘জার্নালিস্ট’ বলে দাবি করেন। কিন্তু তাঁদের অনেকে সঠিক পরিচয়পত্র দেখান না, আবার অনেকে শুধুই মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। সেলিব্রেটিদের ঘিরে ধাওয়া করা, ধাক্কাধাক্কি করা, পথ আটকানো বা হঠাৎ চেঁচিয়ে প্রশ্ন ছোড়া—এসব আচরণ নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়।
জয়ার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—‘সাংবাদিকতা একটা গুরুতর পেশা। সঠিক পরিচয়, সঠিক আচরণ এবং দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি।’ তাঁর মন্তব্যে তাই শুধু ক্ষোভ নয়, বরং অসংগঠিত বিনোদন সাংবাদিকতার দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে।
পাপারাজ্জি সংস্কৃতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে?

গত কয়েক বছরে বলিউডে ‘পাপারাজ্জি কালচার’-এর বিস্তার ব্যাপক। সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টের চাহিদায় প্রতিদিনই নতুন নতুন ভিডিও, এক্সক্লুসিভ শট বা অন-দ্য-স্পট রিঅ্যাকশন সংগ্রহে মরিয়া হয়ে পড়ছে অনেক মিডিয়া ইউনিট। এই প্রতিযোগিতা কখনও কখনও পেশাগত নীতিমালা ভাঙতে বাধ্য করছে।
সেলিব্রেটিরা জানান, প্রতিনিয়ত ক্যামেরার সামনে থাকতে গিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মানসিক চাপ বেড়ে যায়। কারও পরিবার, কারও সন্তান নিয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্ত তৈরি হয়। এমনকি বিমানবন্দর, হাসপাতাল, বাড়ির সামনে—কোথাওই যেন নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে সেলিব্রেটিদের ওপর পাপারাজ্জিদের আচরণ রীতিমতো অসম্মানজনক। কখনও গাড়ির দরজা আটকে দেওয়া, কখনও ধাক্কা লাগিয়ে দেওয়া—এসব ঘটনা দর্শকদেরও ক্ষুব্ধ করছে। জয়া বচ্চনের মন্তব্য সেই চলমান বিতর্ককেই আরও জোরালো করেছে।
মিডিয়ার দায় ও ভবিষ্যৎ সমাধান কী?
বিনোদন সাংবাদিকতার গুণগত মান নিয়ে বহুদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। টিআরপি, ক্লিকবেট ও সোশ্যাল মিডিয়া এনগেজমেন্টের চাপে সংবাদ সংগ্রহের মৌলিক নীতিগুলো পিছনে পড়ে যাচ্ছে। সেই জায়গাতেই জয়া বচ্চনের বক্তব্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
সমাধান কী?
- সঠিক পরিচয়পত্র ও অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকতা নয়
প্রতিটি সাংবাদিককে নির্দিষ্ট অনুমোদন ও আইডি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা উচিত। - এয়ারপোর্ট ও জনবহুল স্থানে নির্দিষ্ট জোন
সেলিব্রেটিদের চলাচল নিরাপদ রাখতে নির্দিষ্ট প্রেস করিডর বা জোন করা যেতে পারে। - মিডিয়া ইউনিটগুলির দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি
অরগানাইজড মিডিয়া হাউজগুলিকে দায়িত্ব নিতে হবে যাতে অনিয়ন্ত্রিত ও অযাচিত আচরণ নিয়ম না হয়ে যায়। - সেলিব্রেটি–মিডিয়া সম্পর্ককে পেশাগত রাখা
ব্যক্তিগত পরিসরে অতিরিক্ত অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে কঠোর বিধি তৈরি প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে শুধু সেলিব্রেটিরাই নয়, সাধারণ নাগরিকেরাও চান আরও শৃঙ্খলাপূর্ণ ও সম্মানজনক মিডিয়া পরিবেশ। জয়ার মন্তব্য তাই বৃহত্তর সমস্যার একটি প্রতিচ্ছবি।
জয়া বচ্চনের ক্ষোভ হয়তো ব্যক্তিগত, কিন্তু তার প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতা শুধু খবর সংগ্রহ নয়, এটি আচরণ, নীতি, দায়িত্ব ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়। বিনোদন সাংবাদিকতার বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর বক্তব্য একটি প্রয়োজনীয় আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমের যুগে সংবাদ সংগ্রহের ধরন বদলেছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে পেশাগত নীতিও নতুন করে গঠন করা জরুরি। জয়া বচ্চনের মন্তব্য সেই পরিবর্তনের দিকে একটি শক্ত ইঙ্গিত—সেলিব্রেটি হোক বা সাধারণ মানুষ, সকলেরই ব্যক্তিগত পরিসর ও নিরাপত্তা সম্মান পাওয়া উচিত।






