জাদবপুরের এক বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-এর অস্বাভাবিক মৃত্যু নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল প্রশাসনিক চাপ, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মানসিক সুরক্ষা। মৃত BLO–র বিধবা এবার সরাসরি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ দায়ের করলেন, যেখানে তিনি বিশেষভাবে SIR (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত অতিরিক্ত চাপের কথা তুলে ধরেছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধন ও যাচাইয়ের কাজে অমানবিক সময়সীমা, লাগাতার তদারকি এবং ঊর্ধ্বতন মহলের চাপ তাঁর স্বামীকে চরম মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। এই চাপই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ বলে দাবি করেছেন পরিবার।
ঘটনাটি সামনে আসতেই জাদবপুর-সহ গোটা রাজ্যে প্রশাসনিক কর্মীদের কর্মপরিবেশ ও দায়িত্ববণ্টন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে যুক্ত অস্থায়ী ও নিম্নপদস্থ কর্মীদের উপর চাপ কতটা যুক্তিসঙ্গত—তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রশাসন, নির্বাচন দফতর এবং রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া এখন নজরের কেন্দ্রে।
BLO–র মৃত্যু ও বিধবার অভিযোগের বিস্তারিত

বিধবার দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, SIR–এর আওতায় ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলাকালীন তাঁর স্বামীকে দিনের পর দিন অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছিল। বাড়তি এলাকা কভার করা, অনিয়মিত সময়ে রিপোর্ট জমা দেওয়া এবং বারবার ফোন করে অগ্রগতির হিসাব চাওয়া—এই সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
পরিবারের দাবি, BLO–কে মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া হতো যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ভয় ও মানসিক চাপে তিনি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কাজের চাপ নিয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার ধারায় নথিভুক্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
SIR প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক চাপের প্রশ্ন


Special Intensive Revision বা SIR মূলত ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও ভুয়ো নাম বাদ দেওয়ার জন্য চালু করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বুথ লেভেল অফিসারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযোগ উঠছে, বাস্তবে এই কাজের সময়সীমা ও পরিকাঠামো প্রায়ই বাস্তবসম্মত হয় না।
একাধিক BLO জানিয়েছেন, সীমিত জনবল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়াই তাঁদের বিশাল এলাকা কভার করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কাজের পাশাপাশি অন্য দায়িত্বও সামলাতে হয়। ফলে মানসিক ও শারীরিক চাপ বেড়ে যায়।
জাদবপুরের ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে—SIR প্রক্রিয়ায় কি পর্যাপ্ত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা হচ্ছে? নাকি কেবল লক্ষ্যপূরণের তাগিদেই মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উপর বাড়তি বোঝা চাপানো হচ্ছে?
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া

ঘটনার পর প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্ত হবে এবং কোনও গাফিলতি প্রমাণিত হলে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নির্বাচন দফতরের একাংশ অবশ্য দাবি করেছে, SIR একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনেই কাজ করানো হয়।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মহল বিষয়টিকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছে। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নামে কর্মীদের উপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যার ফলেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে।
এই টানাপোড়েনে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গিয়ে কি মানবিক দিকটি উপেক্ষিত হচ্ছে?
জাদবপুরের BLO–র মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। SIR-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা বাস্তবায়নের সময় মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়াও সমান জরুরি।
বিধবার অভিযোগের তদন্ত কী ফল দেয়, তার উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনের রূপরেখা। তবে এই ঘটনা ইতিমধ্যেই একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—কাজের ফলাফল না মানবিক মূল্যবোধ, কোনটি অগ্রাধিকার পাবে?






