দক্ষিণ কলকাতার বাঘাযতীন এলাকায় মধ্যরাতে ঘটে গেল এক শিহরণ জাগানো খুনের ঘটনা। একটি আবাসনের ছাদে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হয় এক যুবকের দেহ, যা ঘিরে আতঙ্ক ছড়ায় গোটা এলাকায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পরপর গুলির শব্দ শুনে চমকে ওঠেন বাসিন্দারা। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রক্তাক্ত অবস্থায় মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, নিহত ব্যক্তি ওই আবাসনেরই বাসিন্দা ছিলেন এবং তাঁর বয়স আনুমানিক তিরিশের কাছাকাছি। ঘটনার পর থেকেই এলাকা জুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। কী কারণে এমন নৃশংস খুন, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। পারিবারিক বিবাদ, আর্থিক লেনদেন, নাকি অন্য কোনও বড় চক্র—সব দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চারজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে স্থানীয় সিন্ডিকেট সংযোগ থাকতে পারে বলে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে। আবাসন নির্মাণ, চাঁদাবাজি এবং জমি সংক্রান্ত বিবাদের সূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহতের পরিবার দাবি করেছে, তিনি কোনও বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—তাহলে কেন টার্গেট করা হল তাঁকে? পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে গুলি করা হয়েছে কি না, তাও তদন্তের মূল কেন্দ্রে।
আবাসনের ছাদে পরিকল্পিত হামলা? রাতের ঘটনার টাইমলাইন

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে কয়েকজন ব্যক্তি আবাসনে প্রবেশ করে। সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজনদের গতিবিধি ধরা পড়েছে বলে খবর। তারা সরাসরি ছাদে উঠে যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির শব্দ শোনা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথমে তাঁরা আতশবাজি বা গাড়ির শব্দ ভেবে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কয়েক মিনিট পর চিৎকার শুনে সন্দেহ হয়। পরে ছাদে গিয়ে রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান কয়েকজন।
পুলিশের ধারণা, হামলাকারীরা নিহত ব্যক্তিকে আগে থেকেই চিনত। কারণ, আবাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ছাদে পৌঁছনো সহজ নয়। এতে পরিকল্পিত হত্যার সম্ভাবনাই বেশি।
ঘটনার পর অভিযুক্তরা দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবে মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ও সিসিটিভির সূত্র ধরে পুলিশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চারজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতার ৪, উঠে আসছে ‘সিন্ডিকেট’ যোগ—কী বলছে পুলিশ?

গ্রেফতার হওয়া চারজনের মধ্যে দুজন স্থানীয় এবং বাকি দুজন বাইরের এলাকা থেকে এসেছে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে আগেও অপরাধের অভিযোগ ছিল। পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে বলে দাবি করছে।
তদন্তকারীদের মতে, এটি কোনও আকস্মিক ঝগড়ার ফল নয়। বরং পূর্বপরিকল্পিত খুন। সিন্ডিকেট সংক্রান্ত আর্থিক বিবাদ, চাঁদাবাজি বা নির্মাণ ব্যবসার দ্বন্দ্ব এই হত্যার কারণ হতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই নির্মাণ সংক্রান্ত প্রভাব বিস্তার নিয়ে টানাপোড়েন চলছিল। নিহত ব্যক্তি নাকি সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছিলেন। যদিও পরিবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পুলিশ এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সিন্ডিকেট যোগের কথা ঘোষণা না করলেও তদন্তের অন্যতম প্রধান দিক হিসেবে এটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও গ্রেফতার হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
এলাকায় আতঙ্ক, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন—বাসিন্দাদের দাবি কড়া পদক্ষেপ

ঘটনার পর থেকেই এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বহু বাসিন্দা জানিয়েছেন, রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। আবাসনে নিরাপত্তারক্ষী থাকলেও এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনেকেই দাবি করেছেন, এলাকায় অপরাধমূলক কার্যকলাপ আগেও ঘটেছে কিন্তু পর্যাপ্ত নজরদারি ছিল না। এই ঘটনার পর তাঁরা পুলিশের টহল বাড়ানোর দাবি তুলেছেন।
নিহতের পরিবার ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি করেছে। তাঁদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে এই খুন করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তদন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
বাঘাযতীনের এই মধ্যরাতের খুন শুধুমাত্র একটি অপরাধের ঘটনা নয়—এটি শহরের নিরাপত্তা ও অপরাধচক্র নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আবাসনের মতো সুরক্ষিত জায়গায় ঢুকে পরিকল্পিতভাবে গুলি চালানো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
গ্রেফতার হওয়া চারজনের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে। যদি সত্যিই সিন্ডিকেট সংযোগ প্রমাণিত হয়, তবে এটি বৃহত্তর অপরাধচক্রের ইঙ্গিত দিতে পারে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা এখন একটাই অপেক্ষায়—দোষীদের দ্রুত শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে তার নিশ্চয়তা। তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের নির্দেশই নির্ধারণ করবে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত পরিণতি।






