বাংলা চলচ্চিত্রে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু নির্মাণ সামনে এসেছে, যেগুলি প্রচলিত গল্প বলার ধরন থেকে সরে এসে দর্শকদের অনুভূতির উপর বেশি ভরসা করছে। সেই ধারাতেই নতুন সংযোজন ‘কাতুকুতু বুড়ো’ (Katukutu Buro)। পরিচালক, অভিনেতা ও চিত্রনাট্যকার উজান গাঙ্গুলী-র প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের টিজার মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে কৌতূহল, আলোচনা এবং রহস্যের আবহ।
কোনও ভূমিকা নেই, কোনও টাইটেল কার্ড নেই, এমনকি দর্শককে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগও নেই। টিজারের শুরুতেই দেখা যায় এক ব্যক্তি যেন শ্বাস নেওয়ার জন্য লড়াই করছেন। দূরে ভেসে আসছে জন্মদিন উদযাপনের শব্দ। সেই আনন্দের শব্দই কি তাঁকে আতঙ্কিত করছে? নাকি অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে আরও ভয়ঙ্কর কোনও সত্য? এই প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর টিজার দেয় না।
ঠিক পরের মুহূর্তেই দৃশ্য বদলে যায়। দুই বন্ধুর হাসি, এক শিশুর হাতে সুপারহিরো অ্যাকশন ফিগার—সবকিছু যেন স্বাভাবিক, পরিচিত এবং নির্ভার। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার মধ্যেই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। রাতের অন্ধকারে সেই একই শিশুর পাশে দেখা যায় তার অ্যাকশন ফিগারটিকে—আর সেটি আর খেলনা নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ এক মানবাকৃতি ছায়া। কোনও ব্যাখ্যা নেই, কোনও সংলাপ নেই। তবুও এই একটি দৃশ্য দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়।
মাত্র দেড় মিনিটেরও কম সময়ে ‘কাতুকুতু বুড়ো’ এমন এক আবেগের যাত্রা তৈরি করে, যেখানে আনন্দ আর আতঙ্কের সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যায়। টিজার শেষ হওয়ার পরও প্রশ্নগুলো রয়ে যায়, আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
রহস্য, স্মৃতি ও শৈশবের অদ্ভুত সংমিশ্রণে তৈরি টিজার
টিজারের অন্যতম বড় শক্তি তার ভিজ্যুয়াল ভাষা। কোনও দৃশ্যকে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা না করে দর্শকের কল্পনাকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। প্রতিটি ফ্রেম যেন একটি অসম্পূর্ণ স্মৃতি, যার অর্থ খুঁজে নিতে হয় নিজেকেই।
একদিকে রয়েছে শৈশবের নিষ্পাপতা, অন্যদিকে এমন এক অদৃশ্য উপস্থিতি, যা পুরো পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তোলে। ছবির নামের মতোই এই রহস্যময় আবহ দর্শকের মনে কৌতূহল তৈরি করে। ঠিক কী বা কে ‘কাতুকুতু বুড়ো’? কেন তার উপস্থিতি এতটা অস্বাভাবিক? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপাতত গোপনই রেখেছেন নির্মাতারা।
টিজারের গতি অত্যন্ত সংযত। দ্রুত কাট বা অতিরিক্ত ভিএফএক্সের পরিবর্তে আবহ, আলো-ছায়া এবং নীরবতার মাধ্যমে একটি মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের সিনেমাটিক ভাষা খুব বেশি দেখা যায় না, ফলে টিজারটি সহজেই আলাদা করে নজর কেড়েছে।
শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী ও সংগীত নির্মাণ বাড়িয়েছে প্রত্যাশা
এই ছবির টিজারে দেখা গিয়েছে প্রয়াত রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, লামা হালদার, অনুজয় চট্টোপাধ্যায়, উজান গাঙ্গুলী এবং নবাগত রাপূর্ণা ভট্টাচার্য-কে। এছাড়াও ছবির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন চূর্ণী গাঙ্গুলী, বিশ্বনাথ বসু, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, শঙ্কর চক্রবর্তী-সহ আরও অনেকে।
সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন দেবায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, উজান গাঙ্গুলী এবং Cizzy। টিজারের আবহসংগীত ছবির রহস্যময় পরিবেশকে আরও গভীর করে তুলেছে। কোথাও উচ্চকিত নয়, বরং সংযত এবং আবেগনির্ভর সাউন্ড ডিজাইনই দর্শককে দৃশ্যের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়।
টিজারের অন্যতম আকর্ষণ হল এর আবহ নির্মাণ। এখানে ভয় দেখানোর চেষ্টা নেই, বরং ধীরে ধীরে অস্বস্তি তৈরি করার কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। এই মনস্তাত্ত্বিক টানটান আবহই ছবিটিকে প্রচলিত হরর বা থ্রিলারের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
প্রেমের গল্পের আড়ালে কী লুকিয়ে আছে ‘কাতুকুতু বুড়ো’-র আসল রহস্য?
পরিচালক উজান গাঙ্গুলী টিজার প্রসঙ্গে বলেন,
“The teaser of Katukutu Buro invites you into a familiar world, then quietly changes the rules. It reminds us that even within a dreary, dusty reality, a pop of colour, a spark of magic can appear. Everything has a reason; we’ll have to wait until 24th July for the answers.”
অন্যদিকে, ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করতে চলা রাপূর্ণা ভট্টাচার্য জানান,
“The teaser evokes a feeling of unease and comfort in the same breath and doesn’t ask to be understood. It lingers. That’s what drew me to Paro and the storyline. She is here to stay. I can’t wait for audiences to experience this thrill in the theatres.”
ছবির কেন্দ্রে রয়েছে কেদার ও পারো-র প্রেমের গল্প। কিন্তু এটি শুধুমাত্র একটি রোম্যান্টিক কাহিনি নয়। প্রেমের পাশাপাশি এখানে রয়েছে এক অদ্ভুত অন্ধকার, এমন একটি অতীত, যা ফিরে এসেছে এবং যার নাম উচ্চারণ করতেও যেন অনীহা ছবির।
টিজারের শেষ পর্যন্ত কোথাও স্পষ্ট করে বলা হয় না, ঠিক কী ঘটছে। কিন্তু সেই না-বলার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ছবির আকর্ষণ। দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলাই যেন এই টিজারের মূল উদ্দেশ্য। ফলে আগামী ২৪ জুলাই, ছবিটি মুক্তির অপেক্ষা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলা সিনেমায় এমন টিজার খুব কমই দেখা যায়, যা গল্পের চেয়ে অনুভূতির উপর বেশি নির্ভর করে। ‘কাতুকুতু বুড়ো’ ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। রহস্য, স্মৃতি, শৈশব, প্রেম এবং অদ্ভুত এক অন্ধকারের মিশেলে তৈরি এই টিজার দর্শকদের সামনে এমন এক অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না।
মাত্র দেড় মিনিটের এই ঝলকই প্রমাণ করে, উজান গাঙ্গুলীর প্রথম চলচ্চিত্র কেবল একটি গল্প বলতে আসছে না; বরং দর্শককে এমন এক অনুভূতির ভেতর নিয়ে যেতে চাইছে, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়। এখন দেখার অপেক্ষা, ২৪ জুলাই মুক্তির পর ‘কাতুকুতু বুড়ো’ সেই রহস্যের পর্দা কতটা সফলভাবে উন্মোচন করতে পারে।






