আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস স্পেশাল: ৭ বার যখন সঞ্জয় লীলা বনশালি নাচকে রূপান্তরিত করেছেন সেলুলয়েড কবিতায়

আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসে ফিরে দেখা সঞ্জয় লীলা বনশালির পরিচালিত ৭টি কালজয়ী নাচের দৃশ্য। ‘ডোলা রে ডোলা’ থেকে ‘ঢোলিডা’—কীভাবে বনশালি নাচকে কেবল বিনোদন নয়, বরং সেলুলয়েডে এক অমর কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন, জানুন বিস্তারিত এই বিশেষ প্রতিবেদনে।

Table of Contents

Share Our Blog Now :
Facebook
WhatsApp

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সঞ্জয় লীলা বনশালি এমন এক নাম, যাকে রাজ কাপুর, কে. আসিফ কিংবা গুরু দত্তের মতো কিংবদন্তিদের সমপর্যায়ে রাখা হয়। তাঁর প্রতিটি কাজ যেন এক একটি বিশাল ক্যানভাস, যেখানে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতি ও মাটির গল্পকে সবচেয়ে শৈল্পিক ও দৃষ্টিসুখকর উপায়ে ফুটিয়ে তোলেন। ভারতীয় বিনোদন জগতকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর সিনেমা কেবল বক্স অফিস সংগ্রহের পরিসংখ্যান নয়, বরং এক একটি জীবন্ত কিংবদন্তি।

বনশালি পরিচালিত ছবিতে নাচের দৃশ্যগুলো কেবল গান বা বিনোদনের খাতিরে রাখা হয় না; বরং সেগুলো হয়ে ওঠে একেকটি চলমান কবিতা। বনশালির মঞ্চায়নে এক অদ্ভুত শক্তি থাকে। সেখানে কোরিওগ্রাফি কেবল শারীরিক কসরত নয়, বরং নাচের মুদ্রার মাধ্যমে চরিত্রের মনের গহীন আবেগ প্রকাশ পায়। শব্দহীন অবস্থায় চরিত্রগুলো যখন নাচে, তখন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দর্শকদের সাথে কথা বলে। তাঁর প্রতিটি গান যেন গল্পের একেকটি আবেগঘন চূড়া।

এই আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসে আমরা ফিরে তাকাব বনশালির পরিচালিত সেই ৭টি আইকনিক গানে, যেখানে তিনি নাচকে সাধারণ বিনোদনের স্তর থেকে তুলে নিয়ে গেছেন মহাকাব্যিক পর্যায়ের ‘সিনেমেটিক পোয়েট্রি’ বা সেলুলয়েড কবিতায়। দীপিকা পাড়ুকোন থেকে শুরু করে মাধুরী দীক্ষিত এবং আলিয়া ভাট—বনশালির নির্দেশনায় প্রত্যেকেই পর্দার নাচকে এক নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন।

আসন্ন ছবি ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’ নিয়ে দর্শকদের মধ্যে এখনই যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা বনশালির বিগত বছরগুলোর এই অসামান্য সৃজনশীলতারই ফল। চলুন দেখে নেওয়া যাক সঞ্জয় লীলা বনশালির সেই ৭টি জাদুকরী মুহূর্ত যা নাচের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।


১. ‘দিওয়ানি মাস্তানি’ থেকে ‘নাগাড়া সাং ঢোল’: ক্লাসিক্যাল আভিজাত্য ও মাটির টান

বনশালির ‘বাজিরাও মাস্তানি’ ছবিতে দীপিকা পাড়ুকোনের ‘দিওয়ানি মাস্তানি’ গানটি ছিল আভিজাত্য এবং একনিষ্ঠ প্রেমের এক শ্বাসরুদ্ধকর সংমিশ্রণ। বিশাল রাজপ্রাসাদের আইনা মহলে সূক্ষ্ম ক্লাসিক্যাল মুদ্রার মাধ্যমে তিনি যেভাবে বাজিরাওয়ের প্রতি তার সমর্পণ ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এক কথায় অনবদ্য। এই দৃশ্যে দীপিকার চোখের ভাষা আর শরীরের ছন্দ যেন শব্দের চেয়েও বেশি কথা বলেছিল। এটি কেবল একটি নাচ ছিল না, বরং ছিল প্রেমের এক রাজকীয় উপাখ্যান।

অন্যদিকে, ‘গোলিওঁ কি রাসলীলা রাম-লীলা’ ছবিতে ‘নাগাড়া সাং ঢোল’ গানে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শক্তি দেখতে পাই। দীপিকা ও রণবীর সিংয়ের সেই প্রখর এনার্জি এবং গুজরাটি গরবা নাচের যে মেঠো ও শক্তিশালী কোরিওগ্রাফি বনশালি দেখিয়েছেন, তা দর্শকদের শিরায় শিহরণ জাগায়। নাটকীয় আলো আর মাটির ছোঁয়া গানটিকে এক অনন্য মাত্রা দেয়, যা বিদ্রোহ ও আবেগের এক মিশ্রণ।


২. ‘ডোলা রে ডোলা’ ও ‘ঘূমর’: দুই কিংবদন্তি মুহূর্তের মেলবন্ধন

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সেরা নাচের লড়াই বা ‘ফেস-অফ’ হিসেবে পরিচিত ‘দেবদাস’-এর ‘ডোলা রে ডোলা’। মাধুরী দীক্ষিত এবং ঐশ্বর্য রাইয়ের সেই যুগলবন্দী ছিল মার্জিত ভঙ্গি এবং নিখুঁত এক্সপ্রেশনের এক মাস্টারক্লাস। লাল ও সাদা শাড়ির আভিজাত্য আর সমবেত নৃত্যের ছন্দ কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান এবং এক অভিন্ন বিরহের গল্প বলেছিল। বনশালি এখানে দেখিয়েছিলেন কীভাবে একই ফ্রেমে দুই মহাতারকাকে কবিতার মতো সাজানো যায়।

ঠিক একইভাবে ‘পদ্মাবত’ ছবিতে ‘ঘূমর’ গানটির মাধ্যমে বনশালি রাজস্থানি ঐতিহ্য এবং রাজকীয় মর্যাদাকে উদযাপন করেছেন। দীপিকা পাড়ুকোনের সেই ঘূর্ণায়মান ঘাগরা, হাতের সূক্ষ্ম কারুকাজ আর পরিমিত পদক্ষেপগুলো রাজপুত গর্বের প্রতিফলন ছিল। এটি কেবল একটি লোকনৃত্য নয়, বরং এটি ছিল একটি সংস্কৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, যা বনশালির চোখে এক রাজকীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছিল।


৩. ‘নিম্বুদা’ থেকে ‘ঢোলিডা’: উৎসবের আনন্দ ও চরিত্রের রূপান্তর

বনশালির ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একটি অন্যতম বর্ণিল গান হলো ‘হাম দিল দে চুকে সানম’-এর ‘নিম্বুদা নিম্বুদা’। ঐশ্বর্য রাই এবং সালমান খানের উপস্থিতিতে এই গানটি ছিল রঙ, ছন্দ এবং অফুরন্ত আনন্দের এক বিস্ফোরণ। ঐশ্বর্যের চঞ্চল ভঙ্গি আর প্রাণবন্ত কোরিওগ্রাফি যেন তরুণ হৃদয়ের উৎসবের আমেজকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। এটি বনশালির সেই ধারার নাচ যা দর্শকদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে।

পরবর্তীতে ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি’ ছবিতে আলিয়া ভাটের ‘ঢোলিডা’ গানটি ছিল এক প্রকারের মাস্টারস্ট্রোক। উচ্চশক্তির এই গরবা কেবল একটি নাচ ছিল না, বরং এটি ছিল চরিত্রের পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মুহূর্ত। আলিয়ার প্রতিটি স্টেপ ছিল শক্তির প্রতীক, যা গাঙ্গুবাইয়ের ভেতরের লড়াই আর জয়কে উদযাপন করেছে। এর সাথে ‘মোহে রং দো লাল’-এর মতো সূক্ষ্ম ক্লাসিক্যাল টুকরোও বনশালির ঝুলিতে রয়েছে, যা প্রমাণ করে তিনি সব ধরনের নাচে সমান পারদর্শী।


সঞ্জয় লীলা বনশালির নাচের দৃশ্যগুলো যে কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে, তা হলো অভিনেতা, কোরিওগ্রাফি, সংগীত এবং নির্দেশনার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। বনশালি নিশ্চিত করেন যে নাচ যেন কোনোভাবেই সিনেমার গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। প্রতিটি ঘূর্ণি, প্রতিটি পলক আর প্রতিটি বিরতির পেছনে থাকে এক গভীর উদ্দেশ্য। বনশালির ছবিতে নাচ মানেই হলো চরিত্রের অভ্যন্তরীণ পৃথিবীর এক দৃশ্যমান রূপান্তর।

আগামী দিনে ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’ ছবির মাধ্যমে তিনি আবার কীভাবে সেলুলয়েডে ম্যাজিক তৈরি করবেন, তা নিয়ে চলচ্চিত্র প্রেমীদের আগ্রহের শেষ নেই। আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসে এই ৭টি কালজয়ী গানের স্মৃতিচারণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সিনেমা যখন কবিতা হয়ে ওঠে, তখন তার ভাষা হয় সুর আর ছন্দের। বনশালি সেই বিরল শিল্পী, যিনি ভারতীয় ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিবার নতুন করে ও গর্বের সাথে উপস্থাপন করেন।

RELATED Articles :
বিনোদন

‘সাধক বামাক্ষ্যাপা’ টিজার প্রকাশ: মা তারার প্রতি বামার চিরন্তন ভক্তির এক ঝলক

কৌশিকী অমাবস্যার পবিত্র তিথিতে প্রকাশ পেল SVF-এর ‘সাধক বামাক্ষ্যাপা’-র টিজার। তারাপীঠের আবহে বামাচরণ ও মা তারার চিরন্তন সম্পর্ক, সাধনা, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের গল্প নিয়ে কালীপুজো ২০২৬-এ বড় পর্দায় আসছে ছবিটি।

Read More »
বিনোদন

প্রেম যখন বেপরোয়া, সাবধানতার জায়গা থাকে কোথায়? আদৃত-আরিয়ার ‘বেপরোয়া’য় নতুন প্রেমের তীব্রতা

আদৃত রায় ও ডেবিউট্যান্ট আরিয়া রায়কে নিয়ে আসছে অভিরূপ ঘোষের নতুন বাংলা ছবি ‘বেপরোয়া’। প্রেমের তীব্রতা, আবেগ, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার গল্প বলা এই ছবির অফিসিয়াল ট্রেলার ইতিমধ্যেই তৈরি করেছে আগ্রহ। ‘বেপরোয়া’ মুক্তি পাবে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

Read More »
কলকাতা

৫,৬০০ পদ, ১,১০৮ কেজির কেক! জন্মাষ্টমীর ভোগে মন্দিরে মহা আয়োজন

৫,৬০০ পদ এবং ১,১০৮ কেজির বিশাল কেক নিয়ে জন্মাষ্টমীর মহাভোগ আয়োজন। কৃষ্ণের জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে মন্দিরের এই নজিরবিহীন প্রস্তুতি ভক্তদের মধ্যে তৈরি করেছে ব্যাপক আগ্রহ।

Read More »
কলকাতা

কলকাতা পুজোয় নতুন সুরের আবহ, বিশেষ সঙ্গীত রচনা উন্মোচন করলেন পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাট

কলকাতার ৮৪তম মণিকতলা চালতাবাগান লোহাপট্টি দুর্গাপুজোর জন্য বিশেষ সঙ্গীত রচনা উন্মোচন করলেন গ্র্যামি জয়ী পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাট। মহিষাসুরমর্দিনীর আবহ, মোহন বীণা ও তিন প্রজন্মের ভাট পরিবারের সঙ্গীত সহযোগিতায় তৈরি এই সৃষ্টি成为েছে এবারের পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।

Read More »
কলকাতা

কলকাতা পুলিশের পুজো প্রস্তুতি জোরদার: ভিড় সামলাতে বড় মণ্ডপে বিশেষ নজর, ট্রাফিক ও নিরাপত্তা পরিকল্পনায় লালবাজার

দুর্গাপুজোর আগেই বড় প্রস্তুতি শুরু কলকাতা পুলিশের। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, মণ্ডপের গেট ও ব্যারিকেড, জরুরি পরিষেবার পথ এবং পুজো কমিটির তথ্য সংগ্রহে জোর দিচ্ছে লালবাজার। বড় পুজো-কেন্দ্রগুলিতে বাড়তি নজরদারির পাশাপাশি ২০০-র বেশি রাস্তা মেরামতের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

Read More »
error: Content is protected !!