কলকাতার দুর্গাপুজোর আবহে এ বার যুক্ত হল এক বিশেষ সঙ্গীতের অধ্যায়। গ্র্যামি পুরস্কারজয়ী ও পদ্মভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাট কলকাতার মণিকতলা চালতাবাগান লোহাপট্টি দুর্গাপুজোর জন্য একটি বিশেষ সঙ্গীত রচনা উন্মোচন করেছেন। চলতি বছরের ৮৪তম পুজোর ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই তৈরি হয়েছে এই বিশেষ কম্পোজিশন।
এই সৃষ্টির কেন্দ্রে রয়েছে মহিষাসুরমর্দিনী-র আবহ, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য এবং দুর্গাপুজোর ভক্তিমূলক চেতনা। পণ্ডিত ভাট জানিয়েছেন, রচনাটিতে ঐতিহ্যবাহী সুরের পাশাপাশি তবলা, ঢোল, পাখোয়াজ-সহ একাধিক ছন্দবাদ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সঙ্গীতটির মধ্যে উৎসবের গতি ও উদ্দীপনা ফুটে ওঠে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভাট পরিবারের তিন প্রজন্ম। পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাট সুর ও সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি মোহন বীণা বাজিয়েছেন। তাঁর ছেলে সৌরভ ভাট অ্যারেঞ্জমেন্ট, রেকর্ডিং ও মিক্সিংয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। নাতি অথর্ব ভাটও মোহন বীণায় অংশ নিয়েছেন।
চালতাবাগানের এ বছরের ভাবনা ‘Nishan – The Mark’। ছত্তীসগড়ের রামনামি সমাজের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং শরীরে রামনাম লিখে রাখার সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই থিম। সেই ভাবনাকে সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করার উদ্যোগেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ভাটের এই রচনা।
মহিষাসুরমর্দিনীর আবহে দুর্গাপুজোর নতুন সঙ্গীত
এই বিশেষ কম্পোজিশনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মহিষাসুরমর্দিনীর পরিচিত সঙ্গীত-ঐতিহ্যকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা। পণ্ডিত ভাটের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চেয়েছেন দুর্গাপুজোর মূল আবেগের সঙ্গে মহিষাসুরমর্দিনীর ভাবনাকে যুক্ত করতে। তাই ঐতিহ্যবাহী সুরের পাশাপাশি শক্তিশালী রিদম ও ছন্দবাদ্যের ব্যবহার করা হয়েছে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে সঙ্গীতের সম্পর্ক বাংলার সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের। মহালয়ার ভোর থেকে শুরু করে পুজোমণ্ডপের আবহ—সুর, মন্ত্র, ঢাক ও ভক্তিগীতির সমন্বয়ে তৈরি হয় উৎসবের নিজস্ব শব্দভুবন। সেই পরিচিত সাংস্কৃতিক পরিসরে মোহন বীণার মতো একটি স্বতন্ত্র বাদ্যযন্ত্রকে সামনে আনা এই উদ্যোগকে আরও আলাদা করে তুলেছে।
পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাটের সঙ্গীতজীবনের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য তাঁর মোহন বীণা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য তারবাদ্যের কিছু বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে তৈরি এই বাদ্যযন্ত্রকে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। তাঁর ওয়েবসাইটেও মোহন বীণাকে তাঁর সঙ্গীত-পরিচয়ের অন্যতম কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই কারণে কলকাতার পুজোর জন্য তাঁর নতুন সৃষ্টি শুধু একটি থিম সং হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও সমকালীন পুজো-ভাবনার একটি সংযোগ হিসেবেও নজর কাড়ছে।
তিন প্রজন্মের ভাট পরিবার, এক সুরের বন্ধন
এই সৃষ্টির আর একটি বড় আকর্ষণ হল তিন প্রজন্মের শিল্পীর একসঙ্গে কাজ করা। পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাট যেখানে সুর ও সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, সেখানে সৌরভ ভাট পুরো অ্যারেঞ্জমেন্ট, রেকর্ডিং এবং মিক্সিংয়ের কাজ করেছেন। মোহন বীণায় তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন নাতি অথর্ব।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে গুরু-শিষ্য পরম্পরা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। সেই ধারার সঙ্গে পারিবারিক উত্তরাধিকার যুক্ত হলে সঙ্গীতের মধ্যে তৈরি হয় অন্যরকম ধারাবাহিকতা। এই কম্পোজিশনে সেই প্রজন্মান্তরের আদানপ্রদানও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দিক হয়ে উঠেছে।
চালতাবাগানের ‘Nishan – The Mark’ থিমের সঙ্গেও এই ধারণাটি যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ। থিমটি মূলত বিশ্বাস, পরিচয়, স্মৃতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা চিহ্নের কথা বলে। ভাট পরিবারের তিন প্রজন্মের একসঙ্গে সঙ্গীত নির্মাণ সেই ভাবনাকে অন্য একটি মাত্রা দিয়েছে।
‘Nishan’ থেকে বিশ্বমঞ্চে দুর্গাপুজোর বার্তা
এ বছরের চালতাবাগান পুজোর থিমে ছত্তীসগড়ের রামনামি সমাজের ইতিহাস বিশেষভাবে উঠে এসেছে। মন্দিরে প্রবেশের সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে এই সম্প্রদায়ের মানুষ শরীরে রামনাম লিখে নিজেদের দেহকেই এক ধরনের মন্দিরের প্রতীক করে তুলেছিলেন। সেই ইতিহাসই ‘Nishan – The Mark’-এর অন্যতম ভিত্তি।
এই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘Durga Puja Connect’ নামে একটি ডিজিটাল উদ্যোগও। এর লক্ষ্য কলকাতার দুর্গাপুজো, পুজোর ইতিহাস এবং বিভিন্ন আয়োজনকে দেশের বাইরে থাকা বাঙালি ও বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া। অর্থাৎ, এ বছরের উদ্যোগে পুজোর ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই বৃহত্তর ভাবনার মধ্যে পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাটের বিশেষ কম্পোজিশন তাই শুধুমাত্র একটি সঙ্গীত পরিবেশনা নয়। এটি কলকাতার দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সুরের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করার একটি প্রয়াস।
কলকাতার দুর্গাপুজো বরাবরই শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও সামাজিক ভাবনার মিলনস্থল। পণ্ডিত বিশ্ব মোহন ভাটের নতুন এই সৃষ্টি সেই ঐতিহ্যেই নতুন সংযোজন। মহিষাসুরমর্দিনীর সুর, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ছন্দ, মোহন বীণার স্বতন্ত্র ধ্বনি এবং তিন প্রজন্মের শিল্পীর সহযোগিতা—সব মিলিয়ে এই কম্পোজিশন ২০২৬-এর পুজোয় আলাদা সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তৈরি করতে পারে।
চালতাবাগানের ‘Nishan’ যখন বিশ্বাস ও পরিচয়ের চিহ্নকে সামনে আনছে, তখন ভাটের সুর সেই ভাবনাকে শব্দের এক নতুন ভাষা দিচ্ছে। ফলে কলকাতার পুজোমণ্ডপে এ বার শুধু আলো, থিম ও প্রতিমার দর্শন নয়—শোনা যাবে এক নতুন সুরের গল্পও।






