রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ টানাপোড়েনের মাঝে অবশেষে নতুন কূটনৈতিক নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২৮ দফা ইউক্রেন শান্তি পরিকল্পনাকে সামনে রেখে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘোষণা করেছেন যে তিনি “সৎ আলোচনা” করতে প্রস্তুত।
এই অবস্থান শুধু ইউক্রেন নয়, বরং ইউরোপ–মার্কিন ভূরাজনীতি এবং যুদ্ধ–অর্থনীতির ভবিষ্যত দিককে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে।
জেলেনস্কির ‘সৎ আলোচনার’ ঘোষণা: কী বার্তা বহন করছে?
জেলেনস্কির সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এতদিন তিনি যে কোন রকম আলোচনা বা সমঝোতার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছিলেন, সেটি বদলে গিয়ে “honest talks”–এ রাজি হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিবর্তন।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ
মার্কিন কংগ্রেসে ইউক্রেন সহায়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিতর্ক চলছে। বাজেট, অস্ত্রসরঞ্জাম সরবরাহ, এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক বোঝা এখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। ট্রাম্পের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ও তার ‘দ্রুত শান্তি’ প্রতিশ্রুতি জেলেনস্কির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
ফলে, জেলেনস্কির এই ঘোষণা সম্ভবত রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ফল।
ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি: যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতি কার?
ইউরোপ ইতিমধ্যে জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করছে। অনেক দেশ চায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক, কারণ পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হবে, ব্যয় তত বাড়বে।
জেলেনস্কির সিদ্ধান্ত তাই ইউরোপের চাপের দিকেও ইঙ্গিত দেয়।

ট্রাম্পের ২৮ দফা পরিকল্পনা: আসলে কী আছে এর ভেতরে?
যদিও সম্পূর্ণ পরিকল্পনা প্রকাশ্যে নেই, বিভিন্ন সূত্রে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২৮ দফার মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার:
১. অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তার নেতৃত্বে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধের অবসান ঘটানো সম্ভব। যদিও বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন—বাস্তবে দুই পক্ষের শর্ত কি এত সহজে মিলবে?
২. নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং সীমান্ত নির্ধারণ
এই পরিকল্পনার অন্যতম বিতর্কিত অংশ হলো ভবিষ্যৎ সীমান্তরেখা ও দখলকৃত অঞ্চলগুলো নিয়ে আপোষমূলক সমাধান।
ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং রাশিয়ার দাবি—দুইই একসাথে মেলানো কঠিন।
৩. ন্যাটো বিস্তার রোধে নতুন সমঝোতা
ট্রাম্প বরাবরই ন্যাটোর অতিরিক্ত সম্প্রসারণের সমালোচক। তাঁর পরিকল্পনায় ন্যাটোর ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়ার কথা থাকতে পারে।
৪. মার্কিন সহায়তার হিসাব ও ব্যয় কমানো
ট্রাম্পের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বক্তব্য হলো—“আমেরিকা বিশ্বের পুলিশ নয়।”
এই কারণে ইউক্রেন সহায়তার বাজেট পুনর্বিন্যাস তাঁর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

অতিরিক্ত বিশ্লেষণ: এই আলোচনার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুফল
সুফল
- যুদ্ধবিরতি হলে মানবিক সংকট অনেক কমে যাবে
- ইউরোপে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল হবে
- বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি কিছুটা পূর্বের স্থিতিতে ফিরতে পারবে
- বৈশ্বিক নিরাপত্তা উত্তেজনা হ্রাস পাবে
ঝুঁকি
- ইউক্রেন যদি দখলকৃত এলাকা নিয়ে আপোষ করতে বাধ্য হয়, সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
- রাশিয়া সমঝোতাকে নিজের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে
- ভবিষ্যতে একই রকম আগ্রাসনের সুযোগ তৈরি হতে পারে
- পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর হতে পারে
এই আলোচনাগুলো তাই সহজ নয়; প্রতিটি সিদ্ধান্তই বহুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
জেলেনস্কির ‘সৎ আলোচনা’–র ঘোষণা যুদ্ধের গতিপথে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। ট্রাম্পের ২৮ দফা পরিকল্পনা–কে কেন্দ্র করে এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির ঘড়ির কাঁটা আরও দ্রুত ঘুরছে।
যুদ্ধবিরতি, সমঝোতা বা নতুন সংকট—সবই নির্ভর করছে আগামীর আলোচনার ওপর।
এই পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় ইউক্রেন যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়—এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং শান্তির ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করছে।






