কলকাতা: দুর্গাপুজোকে ঘিরে বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার যেন আরও একবার প্রাণ ফিরে পেল। বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ঐতিহ্যবাহী খুঁটি পূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো যুব অ্যাসোসিয়েশন অব মোহাম্মদ আলি পার্কের ৫৮তম বর্ষের দুর্গাপূজা প্রস্তুতি। এমজি মেট্রো স্টেশনের নিকটবর্তী মোহাম্মদ আলি পার্ক দুর্গাপূজা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই শুভ সূচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অসংখ্য ভক্ত, ক্লাব সদস্য, বিশিষ্ট অতিথি এবং শুভানুধ্যায়ীরা।
উত্তর ও মধ্য কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলি পার্কের পুজো প্রতি বছরই শিল্পনৈপুণ্য, অভিনব মণ্ডপসজ্জা, সামাজিক বার্তা এবং দর্শনার্থীদের জন্য সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আলাদা পরিচিতি তৈরি করে। প্রায় ছয় দশকের ঐতিহ্য বহনকারী এই পুজো শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

খুঁটি পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আচার বাঙালির দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। কাঠামো নির্মাণের আগে দেবী দুর্গার আশীর্বাদ কামনা করে এই পূজা সম্পন্ন করা হয়। ঢাকের তালে, মন্ত্রোচ্চারণে এবং ভক্তিমূলক পরিবেশে এদিন উৎসবের আবহ যেন আগেভাগেই ছড়িয়ে পড়ে কলকাতার বুকে।
এবারের খুঁটি পূজায় আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং স্মরণীয় দুর্গাপূজার আয়োজনের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় খুঁটি পূজার শুভ সূচনা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী তথা যুব অ্যাসোসিয়েশন অব মোহাম্মদ আলি পার্কের চেয়ারম্যান শ্রী তাপস রায়, বিধায়ক শ্রী বিজয় ওঝা, কাউন্সিলর শ্রীমতী মীনা দেবী পুরোহিত, বিজেপির উত্তর কলকাতা জেলা সভাপতি শ্রী তমোঘ্ন ঘোষ, সমাজসেবী ও ক্লাবের ভাইস চেয়ারম্যান শ্রী বিনয় দুবে-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিজেপি নেতা শ্রী দিনেশ পাণ্ডে, শ্রী নবীন মিশ্র, শ্রী ভোলা প্রসাদ সোনকর, শ্রী রবি তিওয়ারি, ক্লাবের সদস্য এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী। তাঁদের উপস্থিতিতে খুঁটি পূজার অনুষ্ঠান আরও গৌরবময় হয়ে ওঠে।

প্রথা অনুযায়ী পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, পূজা-অর্চনা এবং শুভ লগ্নে কাঠামো নির্মাণের প্রতীকী সূচনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের দুর্গাপূজার যাত্রা। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি এবং ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবের আবহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে শুধু দুর্গাপূজা আয়োজনই নয়, সামাজিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং শিল্পকলার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিবছর তাদের থিম, মণ্ডপ নির্মাণ, আলোকসজ্জা এবং দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা রাজ্যজুড়ে প্রশংসিত হয়।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয়ে নতুন প্রত্যাশা
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যুব অ্যাসোসিয়েশন অব মোহাম্মদ আলি পার্কের সাধারণ সম্পাদক সুরেন্দ্র কুমার শর্মা বলেন,
“৫৮তম বর্ষের শুভ সূচনায় আমরা আবারও আমাদের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে এমন একটি দুর্গাপূজার আয়োজন করতে চাই, যা প্রত্যেক দর্শনার্থীর কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আমরা আন্তরিকভাবে আশা করছি, জলাধার সংস্কারের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং আমাদের ঐতিহ্যবাহী পার্কটি আবারও পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহারের উপযোগী হবে। সেটিই আমাদের প্রকৃত ঠিকানা, যেখানে আমরা আবারও সকলকে স্বাগত জানাতে চাই।”

তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শুধুমাত্র একটি উৎসব আয়োজন নয়, বরং মোহাম্মদ আলি পার্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারও এখন কমিটির অন্যতম অগ্রাধিকার।
গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির কারণে মূল প্রাঙ্গণে পূজা আয়োজনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তৈরি হলেও, আয়োজকরা আশা করছেন দ্রুত সংস্কার সম্পন্ন হলে আবারও পুরনো গৌরব ফিরে আসবে।
দর্শনার্থীদের সুবিধা, নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জরুরি পরিষেবা এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েও এবার বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কলকাতার দুর্গাপূজার মানচিত্রে মোহাম্মদ আলি পার্কের বিশেষ গুরুত্ব
কলকাতার দুর্গাপূজার ইতিহাসে মোহাম্মদ আলি পার্ক একটি সুপরিচিত নাম। বিশেষ করে মধ্য ও উত্তর কলকাতার অন্যতম আকর্ষণীয় পুজো হিসেবে এটি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও সমান জনপ্রিয়।
প্রতিবছর অভিনব স্থাপত্য, শিল্পসম্মত প্রতিমা, সামাজিক বার্তা এবং নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পুজো দর্শকদের মুগ্ধ করে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার একাধিক পুরস্কারও অর্জন করেছে এই পূজা কমিটি।

শুধু নান্দনিকতা নয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা বহন করাও এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন, যা কলকাতার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কলকাতার অর্থনীতি, পর্যটন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ হয়। সেই দিক থেকেও মোহাম্মদ আলি পার্কের মতো ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
৫৮ বছরের গৌরবময় পথচলায় আরও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল যুব অ্যাসোসিয়েশন অব মোহাম্মদ আলি পার্ক। ঐতিহ্য, শিল্প, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে এবারের দুর্গাপূজাও যে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে, সে আশা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।
খুঁটি পূজার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রা আগামী শারদোৎসবে পূর্ণতা পাবে। জলাধার সংস্কারের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণে আবারও দুর্গাপূজা ফিরে আসুক—এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন আয়োজকরা। এখন শুধু অপেক্ষা, কলকাতার অন্যতম ঐতিহাসিক দুর্গাপূজার আরেকটি স্মরণীয় সংস্করণের।






