সিঙ্গুর—পশ্চিমবঙ্গের শিল্প রাজনীতির ইতিহাসে এক আবেগঘন অধ্যায়। সেই সিঙ্গুরেই দাঁড়িয়ে আবারও শিল্পায়ন নিয়ে আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বার্তা স্পষ্ট—রাজ্যে শিল্প গড়ে উঠবে, কিন্তু কোনওভাবেই কৃষিজমি ও কৃষকের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়।
বছরের পর বছর ধরে ‘শিল্প বনাম কৃষি’ বিতর্কে উত্তাল থেকেছে রাজ্য রাজনীতি। সেই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুধুই রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং একটি নীতিগত অবস্থানের পুনর্ব্যক্তি। তিনি জানিয়ে দিলেন, উন্নয়নের পথ হবে সহাবস্থানের—যেখানে শিল্প ও কৃষি একে অপরের পরিপূরক হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “আমরা শিল্প চাই, কর্মসংস্থান চাই। কিন্তু চাষের জমি কেড়ে নয়। কৃষক আমাদের প্রাণ।” এই বক্তব্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন বহু স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষিজীবী মানুষ, যাঁদের স্মৃতিতে আজও তাজা সিঙ্গুর আন্দোলনের ক্ষতচিহ্ন।
সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই আশ্বাস রাজ্যের ভবিষ্যৎ শিল্পনীতির দিকনির্দেশক বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। প্রশ্ন একটাই—এই ভারসাম্যের বাস্তব রূপ কীভাবে কার্যকর হবে?
সিঙ্গুরে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা: শিল্পায়ন হবে সহাবস্থার পথে
সিঙ্গুরের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন, শিল্পায়নের নামে আর কোনও জোরজবরদস্তি চলবে না। শিল্পের জন্য জমি প্রয়োজন হলে তা হবে অনাবাদি বা শিল্প-উপযোগী জমিতে, অথবা স্বেচ্ছায় জমি দিতে আগ্রহী মানুষের সম্মতিতে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে কীভাবে কৃষিজমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বর্তমান সরকার শিক্ষা নিয়েছে বলে তাঁর দাবি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, উন্নয়ন মানে শুধু কারখানা নয়—উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
এদিনের বক্তব্যে উঠে আসে ‘লোকাল এমপ্লয়মেন্ট’ প্রসঙ্গও। শিল্প হলে প্রথম অগ্রাধিকার পাবেন স্থানীয় যুবক-যুবতীরা—এমন প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। এর ফলে শিল্প ও কৃষি—দুই ক্ষেত্রেই গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে বলে সরকারের ধারণা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গুরের মঞ্চ বেছে নেওয়া নিজেই একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত। একসময়ের আন্দোলনের কেন্দ্র থেকেই শিল্পবান্ধব কিন্তু কৃষক-সংবেদনশীল বার্তা দেওয়া রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
কৃষি সুরক্ষা ও জমি নীতিতে রাজ্য সরকারের অবস্থান

রাজ্য সরকারের জমি নীতির মূল ভিত্তি হল ‘ফার্মার ফার্স্ট’। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, কৃষিজমি রক্ষা করা শুধু আবেগের বিষয় নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ও কৃষক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছে বলে দাবি প্রশাসনের। সেই জায়গা থেকে কোনও নীতিই কৃষিকে দুর্বল করতে পারে না।
সরকারি সূত্রের খবর, নতুন শিল্প প্রকল্প অনুমোদনের আগে জমির চরিত্র, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় মানুষের মতামত—সবকিছু বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে সময় লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সংঘাত কমবে বলেই মত নীতিনির্ধারকদের।
তবে সমালোচকদের একাংশের প্রশ্ন, এত বিধিনিষেধ শিল্প বিনিয়োগে অনীহা তৈরি করবে না তো? এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন—“যে শিল্প কৃষক ও পরিবেশের সম্মান করে না, সেই শিল্প আমাদের দরকার নেই।”
শিল্প বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক বার্তার তাৎপর্য

সিঙ্গুর থেকে দেওয়া এই বার্তা শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় স্তরের বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশেও। রাজ্য সরকার বোঝাতে চাইছে—পশ্চিমবঙ্গ শিল্প-বিরোধী নয়, বরং দায়িত্বশীল শিল্পায়নের পক্ষপাতী।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ই মূল চাবিকাঠি। কৃষি, শিল্প ও পরিবেশ—এই তিনের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।
রাজনৈতিকভাবে এই বার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য সরকারকে শিল্প-বিরোধী তকমা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকে দেওয়া আশ্বাস সেই সমালোচনার জবাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা। জমির চরিত্র বদল, স্থানীয় সম্মতি এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি—সবকিছু ঠিকঠাক কার্যকর না হলে বিতর্ক ফের মাথাচাড়া দিতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সিঙ্গুরে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য একদিকে যেমন অতীতের ক্ষতকে স্মরণ করায়, তেমনই ভবিষ্যতের রূপরেখাও স্পষ্ট করে। শিল্পায়ন হবে, কর্মসংস্থান হবে—কিন্তু কৃষিকে বাদ দিয়ে নয়। এই নীতিই যদি বাস্তবে সফলভাবে কার্যকর হয়, তবে পশ্চিমবঙ্গ একটি নতুন উন্নয়ন মডেলের দিশা দেখাতে পারে।






