পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত। সদ্য প্রকাশিত SIR (Summary Intensive Revision) ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং মহিলা অধিকার সংগঠনগুলির মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ বাড়ছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও, লিঙ্গভিত্তিক এই অসামঞ্জস্যতা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, প্রশাসনিক ত্রুটি, সামাজিক বাস্তবতা ও কাঠামোগত বৈষম্য একসঙ্গে কাজ করেছে, যার ফল ভোগ করছেন নারী ভোটাররা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ অভিবাসী শ্রমিক পরিবার, বিবাহের পর ঠিকানা পরিবর্তনকারী গৃহবধূ কিংবা নথিপত্রে অসঙ্গতির কারণে সহজেই “ডুপ্লিকেট” বা “অকার্যকর” তালিকায় চলে যান। ফলে সংশোধনের সময় তারাই বেশি বাদ পড়ছেন।
এই পরিস্থিতি শুধু ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়েই নয়, বরং নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ভোটাধিকার সুরক্ষা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনে কী বলছে SIR ডেটা

সাম্প্রতিক SIR ডেটা বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মোট নামের একটি বড় অংশই নারী ভোটারের। যদিও নির্বাচন কমিশনের তরফে একে “স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তথাপি সংখ্যার বিচারে এই লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান উপেক্ষা করা কঠিন।
ডেটা অনুযায়ী, মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত বাসিন্দা ও ডুপ্লিকেট এন্ট্রি বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই শ্রেণিগুলিতে নারীর সংখ্যা কেন বেশি? বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলে বহু নারীর নাম এখনও বাবার বাড়ির ঠিকানায় নথিভুক্ত থাকে। বিয়ের পর ঠিকানা বদলালেও ভোটার আইডি সংশোধন না হওয়ায় তারা “স্থানান্তরিত” হিসেবে চিহ্নিত হন।
এছাড়া বহু ক্ষেত্রেই নারীদের পরিচয়পত্রে নামের বানান, বয়স বা ঠিকানার সামান্য অসঙ্গতি থাকায় যাচাই প্রক্রিয়ায় তারা বাদ পড়ছেন। পুরুষদের তুলনায় নারীদের নথি-সংক্রান্ত সচেতনতা ও প্রশাসনিক অ্যাক্সেস কম থাকাও এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নারী ভোটার বাদ পড়ার সামাজিক ও প্রশাসনিক কারণ
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে নারী ভোটার বাদ পড়ার পেছনে একাধিক সামাজিক ও প্রশাসনিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বিবাহ-পরবর্তী ঠিকানা পরিবর্তন একটি বড় ফ্যাক্টর। বহু নারী এখনও নতুন ঠিকানায় ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রক্রিয়াকে জটিল ও সময়সাপেক্ষ মনে করেন।
দ্বিতীয়ত, অভিবাসন। কাজের খোঁজে বা পারিবারিক কারণে রাজ্যের বাইরে বা অন্য জেলায় চলে যাওয়া পরিবারগুলিতে পুরুষদের তুলনায় নারীদের ভোটার তথ্য আপডেট কম হয়। ফলে সংশোধনের সময় তারাই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল বিভাজন। অনলাইন আবেদন, SMS যাচাই বা ডিজিটাল নোটিসের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ কম। ফলে যাচাই প্রক্রিয়ায় সাড়া না দেওয়ার অভিযোগে তাদের নাম বাদ পড়ে যায়।
মহিলা অধিকার কর্মীদের মতে, এই সমস্যা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং কাঠামোগত। ভোটার তালিকা সংশোধনের নিয়ম ও পদ্ধতি এমনভাবে তৈরি, যেখানে পুরুষ-কেন্দ্রিক নথিভিত্তিক বাস্তবতা বেশি প্রাধান্য পায়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও গণতন্ত্রে প্রভাব

এই লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভোটাধিকার খর্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ভোটার বাদ পড়া ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
শাসক শিবির অবশ্য এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলছে, তালিকা সংশোধন সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে এবং লিঙ্গভিত্তিক কোনও পক্ষপাত নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়, এটি প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
পশ্চিমবঙ্গে নারী ভোটাররা ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ হারে ভোটদানে অংশ নেন। ফলে এই ছাঁটাই অব্যাহত থাকলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। নাগরিক সমাজের একাংশ ইতিমধ্যেই স্বচ্ছতা ও পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন একটি প্রয়োজনীয় ও চলমান প্রক্রিয়া হলেও, পশ্চিমবঙ্গের SIR ডেটা যে লিঙ্গভিত্তিক অসামঞ্জস্যতার ছবি তুলে ধরেছে, তা উপেক্ষা করার নয়। নারী ভোটারদের অনুপাতহীনভাবে বাদ পড়া গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধানের জন্য প্রয়োজন লিঙ্গ-সংবেদনশীল নীতির প্রণয়ন, মাঠপর্যায়ের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যাচাই প্রক্রিয়ায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। নচেৎ ভোটার তালিকার “পরিষ্কারকরণ” প্রক্রিয়াই হয়ে উঠতে পারে গণতান্ত্রিক বঞ্চনার নতুন রূপ।






