ভোরের ব্যস্ত কলকাতায় আবারও এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা। বৃহস্পতিবার সকালে টপসিয়া এলাকায় হঠাৎ টায়ার ফেটে উল্টে যায় পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ নিগমের (WBTC) একটি যাত্রীবাহী বাস। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন যাত্রী, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে সকাল আনুমানিক ৭টা নাগাদ, যখন অফিসযাত্রী ও স্কুল-কলেজগামীদের ভিড় ক্রমশ বাড়ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আচমকা বিকট শব্দের পর বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় উল্টে যায়। মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা দ্রুত উদ্ধারকাজে হাত লাগান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ ও অ্যাম্বুল্যান্স। আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার জেরে কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয় টপসিয়া সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায়।
এই দুর্ঘটনা ফের প্রশ্ন তুলছে শহরের গণপরিবহণের নিরাপত্তা, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাত্রী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। একের পর এক দুর্ঘটনার পরও কেন একই ধরনের সমস্যা বারবার সামনে আসছে, তা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন করে বিতর্ক।
টপসিয়ায় কীভাবে ঘটল ভয়াবহ দুর্ঘটনা

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, বাসের সামনের টায়ারটি হঠাৎ ফেটে যাওয়াতেই এই দুর্ঘটনা ঘটে। চালক বাসটির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি এবং সেটি রাস্তার পাশে উল্টে যায়। বাসটিতে সে সময় প্রায় ৩০ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা যাচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার শব্দ এতটাই জোরে ছিল যে আশপাশের দোকানদার ও পথচারীরা ছুটে আসেন। অনেক যাত্রী বাসের ভিতরে আটকে পড়েন। কাচ ভেঙে ও দরজা খুলে তাঁদের বের করা হয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, বাসটি নিয়মিত রুটে চলছিল এবং অতিরিক্ত গতির প্রমাণ মেলেনি। তবে টায়ারের অবস্থা ও বাসটির সাম্প্রতিক সার্ভিসিং সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্ঘটনার সময় রাস্তা ভেজা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।
আহতদের অবস্থা ও হাসপাতালের পরিস্থিতি

আহত ১৪ জনের মধ্যে ৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অন্তত ৬ জন এখনও চিকিৎসাধীন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁকে আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, গুরুতর আহত যাত্রীর মাথা ও বুকে আঘাত লেগেছে। বাকিদের অধিকাংশের হাত-পা ও পিঠে চোট রয়েছে। দুর্ঘটনার ধাক্কায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অনেক যাত্রীকেও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
হাসপাতালে আহতদের পরিবারদের ভিড় দেখা যায়। অনেকেই অভিযোগ করেন, সকালবেলায় বাসে ভিড় থাকলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। কেউ কেউ বাসের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বাস নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন

এই দুর্ঘটনার পর আবার সামনে এসেছে সরকারি বাসগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টায়ার পরীক্ষা, ব্রেক সিস্টেম ও যান্ত্রিক স্বাস্থ্য যাচাই না হলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।
পরিবহণ দপ্তরের একাংশের বক্তব্য, অধিকাংশ বাস নির্দিষ্ট সময় অন্তর সার্ভিসিংয়ের মধ্য দিয়ে যায়। তবে বাস্তবে তা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যাত্রী সংগঠনগুলির দাবি, কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সরকারি বাসের উপর নির্ভর করেন। তাই একটি ছোট ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। টপসিয়ার এই ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই ফের সত্যি করল।
টপসিয়ার WBTC বাস দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শহরের গণপরিবহণ ব্যবস্থার একটি বড় চিত্র তুলে ধরছে। আহতদের দ্রুত চিকিৎসা ও উদ্ধারকাজ প্রশংসনীয় হলেও, মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই ধরনের দুর্ঘটনা কি এড়ানো যেত না?
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, স্বচ্ছ নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং যাত্রী সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। কলকাতার মতো জনবহুল শহরে গণপরিবহণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।






