নন্দীগ্রামে রেল প্রকল্প ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ। বিধানসভা নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই অঞ্চলে রেল পরিকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে কৃতিত্ব দাবি করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও কেন্দ্রীয় স্তরের তৎপরতার ফলেই নন্দীগ্রাম রেল প্রকল্প বাস্তব রূপ পেয়েছে।
এই দাবিকে ‘নির্বাচনী গিমিক’ বলে কটাক্ষ করেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের মতে, প্রকল্পের সূচনা বহু আগেই হয়েছিল, এবং তা কোনও একক নেতার কৃতিত্ব নয়। ফলে উন্নয়ন বনাম রাজনৈতিক প্রচারের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধছে।
নন্দীগ্রাম—একদিকে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রতীক, অন্যদিকে শিল্প ও যোগাযোগ পরিকাঠামোর দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এখানে রেল সংযোগ মানে শুধুই যাতায়াত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় ব্যবসার ভবিষ্যৎ। তাই কৃতিত্বের লড়াইও নিছক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এই আবহে কেন্দ্র–রাজ্য সমীকরণ, উন্নয়নের দাবিদারি এবং ভোটের অঙ্ক—সব মিলিয়ে নন্দীগ্রাম রেল প্রকল্প এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
শুভেন্দু অধিকারীর কৃতিত্ব দাবি: “নন্দীগ্রামের রেল স্বপ্ন বাস্তব”


শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, নন্দীগ্রামে রেল প্রকল্প তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উদ্যোগের ফল। তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্রের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা, প্রকল্পের ডিপিআর (ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট) এগিয়ে নেওয়া এবং জমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন।
বিজেপি সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, নন্দীগ্রামকে বৃহত্তর রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার মাধ্যমে পূর্ব মেদিনীপুরের অর্থনৈতিক চেহারা বদলাতে পারে। কৃষিপণ্য পরিবহণ, ছোট শিল্প এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে এই রেল সংযোগ বড় ভূমিকা নেবে। শুভেন্দুর বক্তব্য, “এই প্রকল্প নন্দীগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই দাবি শুধুই উন্নয়নের ভাষ্য নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা। নন্দীগ্রামে নিজের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতেই এই কৃতিত্ব দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, বিজেপির উন্নয়ন-কেন্দ্রিক রাজনীতির বয়ান জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—প্রকল্পের প্রশাসনিক ও নীতিগত স্তরে সিদ্ধান্ত কারা নিয়েছে, এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার কাঁধে? এই জায়গাতেই বিতর্ক তীব্রতর।
তৃণমূলের পাল্টা আক্রমণ: “গিমিক ছাড়া কিছু নয়”
তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য, নন্দীগ্রাম রেল প্রকল্প কোনও ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়। দলের নেতারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সময় থেকেই যোগাযোগ পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছিল। তাঁদের দাবি, রেল প্রকল্পের প্রাথমিক আলোচনা ও প্রস্তাব আগেই জমা দেওয়া হয়েছিল।
তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “নির্বাচনের মুখে উন্নয়নের ফল নিজেদের ঝুলিতে পুরে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।” তাঁদের মতে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পকে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করাই বিজেপির কৌশল।
এখানেই উঠে আসছে কেন্দ্র–রাজ্য টানাপোড়েনের প্রশ্ন। তৃণমূলের দাবি, রাজ্যের সহযোগিতা ছাড়া জমি অধিগ্রহণ বা স্থানীয় সমন্বয় সম্ভব নয়। ফলে কেবল কেন্দ্রের অনুমোদন বা সাংসদ–বিধায়কের তৎপরতাকে কৃতিত্ব হিসেবে দেখানো বিভ্রান্তিকর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসলে ভোটব্যাঙ্ককে প্রভাবিত করার লড়াই। নন্দীগ্রামে উন্নয়ন মানেই রাজনৈতিক লাভ—এই সমীকরণেই দুই শিবির নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
নন্দীগ্রাম রেল প্রকল্প: উন্নয়ন, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সমীকরণ

বাস্তবতার নিরিখে দেখলে, নন্দীগ্রাম রেল প্রকল্পের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। ভারতীয় রেল-এর সম্প্রসারণ মানে শুধু যাত্রী পরিবহণ নয়, বরং শিল্প ও বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত।
এই অঞ্চলে কৃষিপণ্য, মৎস্যচাষ এবং ক্ষুদ্র শিল্পের আধিক্য রয়েছে। রেল যোগাযোগ উন্নত হলে বাজারে পৌঁছনো সহজ হবে, পরিবহণ খরচ কমবে। স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
তবে রাজনৈতিক সমীকরণ এখানে বড় ভূমিকা নেয়। নন্দীগ্রাম মানেই রাজনৈতিক স্মৃতি, আন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদল। ফলে কোনও উন্নয়ন প্রকল্পই রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে থাকে না। শুভেন্দু অধিকারীর কৃতিত্ব দাবি যেমন বিজেপির জন্য কৌশলগত, তেমনই তৃণমূলের বিরোধিতা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষার অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের কাছে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। কবে কাজ শুরু হবে, কতটা দ্রুত শেষ হবে এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকৃত হবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই রাজনৈতিক দাবিদারির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
নন্দীগ্রাম রেল প্রকল্প ঘিরে শুভেন্দু অধিকারীর কৃতিত্ব দাবি ও তৃণমূল কংগ্রেসের পাল্টা কটাক্ষ—এই দ্বন্দ্ব আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। উন্নয়ন বনাম প্রচার, কেন্দ্র বনাম রাজ্য এবং নেতৃত্বের দাবিদারি—সব মিলিয়ে নন্দীগ্রাম আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশা একটাই—প্রকল্প বাস্তবায়িত হোক, আর উন্নয়নের সুফল পৌঁছাক সাধারণ মানুষের কাছে।






