টলিউডের আলোচিত পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের আগামী ছবিকে কেন্দ্র করে এখনই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। কাস্টিং থেকে শুরু করে চরিত্রের গভীরতা—সবকিছু নিয়েই দর্শকের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। এর মধ্যেই সামনে এসেছেন নতুন মুখ সৌমেন, যাকে অনেকে ইতিমধ্যেই তুলনা করতে শুরু করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে।
সৌমেনের চেহারা, বাচনভঙ্গি ও অভিনয়ের স্বাদ দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে মন্তব্য—‘দ্বিতীয় অনির্বাণ’। কিন্তু এই উপাধিতে নাকি বিরক্তই হয়ে উঠেছেন অভিনেতা। তাঁর কথায়, “এতদিন ধরে শুনছি যে আমি অনির্বাণদার মতো নাকি দেখতে। কিন্তু আমি তো নিজেই আমার নিজের জায়গা তৈরি করতে চাই!”
অভিনেতার এই প্রতিক্রিয়া শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পরিচয়–রাজনীতির গভীরে আলো ফেলে। টলিউডের সৃজনশীল জগতে যখন বারবার নতুন মুখদের নিজেদের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তখন ‘দ্বিতীয়’ তকমা যেন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ঠিক সেই জায়গাতেই সৌমেনের সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সৃজিতের নতুন সিনেমা নিয়ে জল্পনা যখন তুঙ্গে, তখন সৌমেনের মন্তব্য এই ছবির প্রতি আরও কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে শিল্পী মহলে।
ধারণার বাইরে নিজের পরিচয়: সৌমেনের অবস্থান

অভিনেতা সৌমেন জানান, তিনি কোনওভাবেই চান না যে তাঁর পরিচয় অন্য কারও ছায়ায় ঢাকা পড়ুক। “অনির্বাণদাকে আমি অত্যন্ত সম্মান করি। তাঁর অভিনয় অসাধারণ। কিন্তু তাই বলে আমাকে তাঁর দ্বিতীয় সংস্করণ বলা হবে কেন? আমার তো নিজস্ব অভিনয়শৈলী আছে,”—বলছেন তিনি।
এ কথা বলার মধ্যেই ফুটে ওঠে অভিনয়ের জগতে ব্যক্তিসত্তার লড়াই। যখন কোনও শিল্পী প্রথমবার পর্দায় আসেন, দর্শক সহজেই তাকে তুলনা করে ফেলেন প্রতিষ্ঠিত মুখদের সঙ্গে। অনেকে জাত অভিনেতা হলেও এই তুলনা তাঁদের আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দেয়। সৌমেন সেই স্রোতে না গিয়েই শুরুতেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
শিল্পী মহলে অনেকেই মনে করছেন, তাঁর এমন স্পষ্ট বক্তব্য ভবিষ্যতে তাঁকে আরও পরিণত শিল্পী হতে সাহায্য করবে। কারণ নিজের পরিচয় রক্ষার এই সংগ্রামই শেষমেশ একজন অভিনেতাকে দীর্ঘপথে টিকিয়ে রাখে।
সৃজিতের নতুন ছবিতে সৌমেনের চরিত্র নিয়ে উত্তেজনা

পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় সাধারণত গল্প ও চরিত্র নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য পরিচিত। সৌমেনের চরিত্র নিয়েও নাকি তিনি ভেবেছেন কিছু আলাদা। সূত্রের খবর, ছবিতে সৌমেন এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করছেন যা একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক, সংবেদনশীল এবং বাস্তবের খুব কাছাকাছি।
এমন চরিত্র পাওয়ার সুযোগ অনেক সময় পাওয়া যায় না। তাই সৌমেনও নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে, তিনি চরিত্রের ব্যাকস্টোরি থেকে শুরু করে তাঁর চোখের ভাষা পর্যন্ত—সবকিছু রপ্ত করছেন ভীষণ যত্নে।
টলিউডে নতুন মুখদের জন্য পথ কখনও সহজ নয়। কিন্তু সৃজিতের মতো পরিচালকের ছবিতে জায়গা পাওয়া মানেই বড় আস্থা। আর সেই কারণেই এই চরিত্রের মাধ্যমে নিজের জায়গা পোক্ত করতে চাইছেন সৌমেন।
দর্শকরা ইতিমধ্যেই অনুমান করতে শুরু করেছেন ছবির গল্পের ধরন নিয়ে। অনেকে বলছেন এটি থ্রিলার, কেউ বলছেন ড্রামা ও রিয়ালিজমের মিশেল। যদিও পরিচালক এখনও মুখ খোলেননি, কিন্তু অভিনেতাদের প্রস্তুতি দেখে বোঝা যাচ্ছে কিছু আলাদা তৈরি হচ্ছে এবার।
অনির্বাণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে তুলনা—টলিউডের বড় প্রবণতা?

শুধু সৌমেনই নন, টলিউডে নতুন অনেক মুখকেই নানাভাবে তুলনা করা হয়। বিশেষ করে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মতো শক্তিশালী অভিনেতার সঙ্গে। তাঁর অভিনয়ের বহুমাত্রিকতা এতটাই বিস্তৃত যে অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও নতুনদের সঙ্গে তাকে মেলাতে চান।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটা কি ন্যায্য?
শিল্পী মহলের একাংশ মনে করেন, এমন তুলনা প্রতিভাকে দমিয়ে রাখে। আবার অন্যপ্রান্তের দাবি, তুলনা থেকেই শেখার জায়গা তৈরি হয়। তবে যাই হোক, ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা যে যে–কোনও শিল্পীর জন্য অপরিহার্য, তা সৌমেনের বক্তব্যেই স্পষ্ট।
একইসঙ্গে এই প্রবণতা টলিউডের দর্শকের মনস্তত্ত্বকেও তুলে ধরে। তাঁরা এতটাই অভ্যস্ত কিছু পরিচিত মুখের অভিনয়শৈলী দেখতে যে নতুনদের ক্ষেত্রেও সেই ছাঁচ খুঁজে বেড়ান। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি শিল্পীর নিজস্ব অভিব্যক্তি থাকে—যা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
সৌমেন নিজের লড়াই শুরু করেছেন ঠিক এই জায়গাটায়—যেখানে তাঁকে আর ‘দ্বিতীয়’ হিসেবে নয়, বরং ‘প্রথম সৌমেন’ হিসেবেই মনে রাখতে চান দর্শকরা।
সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের আগামী ছবি নিয়ে যতটা আলোচনা চলছে, তার চেয়ে কম নয় সৌমেনের বক্তব্যকে ঘিরে চলা বিতর্ক। তবে দিনের শেষে একটি ব্যাপার স্পষ্ট—এই অভিনেতা নিজের অভিনয়যাত্রা নিয়ে একেবারেই সিরিয়াস। তিনি কারও অনুকরণ করতে চান না, বরং নিজের পথ নিজেই তৈরি করতে চান।
টলিউডে এই মুহূর্তে নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের জন্য সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে তুলনা ও প্রত্যাশার চাপ। এই পরিপ্রেক্ষিতে সৌমেনের সোজাসাপ্টা বক্তব্য একদিকে যেমন আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, অন্যদিকে শিল্পী–পরিচয়ের প্রতি অটল বিশ্বাসও দেখায়।
সব মিলিয়ে, সৃজিতের নতুন ছবিতে সৌমেনের পারফরম্যান্স নিয়ে দর্শকের আগ্রহ এখন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তাঁকে নিয়ে যে ‘দ্বিতীয় অনির্বাণ’ বিতর্ক চলছে, তা তিনি অভিনয় দিয়েই নিঃসন্দেহে থামাতে চাইবেন।






