বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণের আমেজকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে প্রতি বছরই টলিউড কিছু না কিছু চমক নিয়ে হাজির হয়। তবে এবারের পহেলা বৈশাখের শ্রেষ্ঠ উপহারটি এল পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুক্তি পেল ‘গুপ্তধন’ ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় ছবি ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’-এর প্রথম টিজার। আবির চট্টোপাধ্যায় থুড়ি আমাদের সকলের প্রিয় সোনাদা ফিরছেন তার দুই সঙ্গী ঝিনুক আর আবিরকে নিয়ে। এবার তাদের গন্তব্য সুন্দরবনের রহস্যময় বাদাবন।
এসভিএফ (SVF)-এর প্রযোজনায় তৈরি এই ছবিটিকে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরেই দর্শকদের মধ্যে তুঙ্গে ছিল উত্তেজনা। পহেলা বৈশাখের শুভ লগ্নে এই টিজার মুক্তি যেন এক নতুন উৎসবের সূচনা করল। আগামী ১৫ই মে বড় পর্দায় মুক্তি পেতে চলেছে এই অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্যে মোড়া ছবিটি। বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে আধুনিক বুদ্ধির লড়াই— এই ফর্মুলাই আরও একবার পর্দায় ম্যাজিক তৈরি করতে চলেছে।
সুবর্ণ সেনের চিরচেনা বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি আর রহস্যভেদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা টিজারের শুরুতেই দর্শককে নস্টালজিক করে তোলে। প্রতাপাদিত্যের হারিয়ে যাওয়া গুপ্তধনের সন্ধানে এবারের যাত্রা। পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিহাসের অলিগলি থেকে রহস্যের সুতো বের করে আনতে সিদ্ধহস্ত, আর এবারের পটভূমি হিসেবে সুন্দরবনকে বেছে নেওয়া কাহিনীতে যোগ করেছে এক ভিন্ন মাত্রা। কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গল আর সুন্দরী-গড়ান গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন রহস্য উন্মোচনের লড়াই এখন সময়ের অপেক্ষা।
পহেলা বৈশাখের চমক: সুবর্ণ সেনের নতুন অভিযান
বাঙালির আবেগের নাম সোনাদা। অধ্যাপক সুবর্ণ সেনের চরিত্রে আবির চট্টোপাধ্যায় যেভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন, তাতে সোনাদাকে ঘিরেই এখন আবর্তিত হয় বাঙালির রহস্য উন্মোচনের আকাঙ্ক্ষা। ‘গুপ্তধন’ ফ্র্যাঞ্চাইজির আগের দুটি ছবি— ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ এবং ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’ বক্স অফিসে যে সাফল্য পেয়েছিল, ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’ সেই সাফল্যের ধারা বজায় রাখবে বলেই টিজার দেখে মনে হচ্ছে। পহেলা বৈশাখের পুণ্য মুহূর্তে দর্শকদের জন্য এই উপহারটি ছিল পরিচালক এবং প্রযোজনা সংস্থার এক সুপরিকল্পিত চমক।
টিজারের শুরুতেই আমরা দেখি সুবর্ণ সেনকে, যার চোখে সেই পুরোনো উজ্জ্বলতা। এক নতুন রহস্যের সংকেত তাকে আরও একবার টেনে এনেছে বিপদের মুখে। সোনাদার সাথে সবসময়ই থাকে তার ছায়াসঙ্গী আবির (অর্জুন চক্রবর্তী) এবং ঝিনুক (ঈশা সাহা)। এবারের টিজারেও এই ত্রয়ীর রসায়ন দর্শকদের নজর কেড়েছে। তবে এবার তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী অভিনেতা, যার চরিত্রটি নিয়ে ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চা শুরু হয়ে গেছে।
সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে রহস্যের বুনন পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত নিপুণভাবে করেছেন। টিজারের দৃশ্যগুলো দেখলেই বোঝা যায় যে, সিনেমাটোগ্রাফিতে এবার অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গহীন অরণ্য, নদী এবং প্রাচীন স্থাপত্যের যে ঝলক দেখা গেছে, তা একাধারে রোমাঞ্চকর এবং ভীতিকর। সুবর্ণ সেনের অ্যাডভেঞ্চার মানেই তো ইতিহাসের সাথে আধুনিকতার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন, যা এবার আরও বড় পরিসরে ফিরছে।
সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে প্রতাপাদিত্যের গুপ্তধন
ইতিহাস সবসময়ই আমাদের অবাক করে, আর সেই ইতিহাসের পাতায় যখন যোগ হয় গুপ্তধনের গন্ধ, তখন বাঙালির কাছে তার চেয়ে বড় পাওনা আর কিছু হতে পারে না। এবারের ছবির মূল উপজীব্য প্রতাপাদিত্যের কিংবদন্তি এবং তার হারিয়ে যাওয়া বিপুল ধনসম্পদ। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপাদিত্যের ইতিহাস সুন্দরবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। সেই হারিয়ে যাওয়া সম্পদ উদ্ধারের নেশাতেই সোনাদা এবার পা বাড়িয়েছেন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে।
সুন্দরবন এমন এক জায়গা যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে বিপদ। টিজারে দ্রুতগামী সব শট আর রোমহর্ষক আবহ সঙ্গীত প্রমাণ করে যে, এবারের লড়াইটা সহজ হবে না। বনের পশু আর প্রকৃতির প্রতিকূলতার পাশাপাশি রয়েছে কিছু অজানা শত্রু, যারা সুবর্ণ সেনের পথ আগলে দাঁড়াতে চায়। রহস্যের জট খুলতে খুলতে যখন সোনাদা ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করেন, তখনই বেরিয়ে আসে অজানা সব সত্য। টিজারের শেষ দৃশ্যে প্রধান তিন চরিত্রের মুখে ভীতি আর সংকল্পের যে ছায়া দেখা গেছে, তা দর্শকদের মনে হাজারো প্রশ্ন জাগিয়ে দেয়।
এই ছবি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবির চট্টোপাধ্যায় বলেন, “সুবর্ণ সেনের চরিত্রে ফিরে আসাটা সবসময়ই এক নতুন চ্যালেঞ্জ। সুন্দরবনের এই পরিবেশ আমাদের আগেকার সব অভিযানের চেয়ে আলাদা। আমরা এই ছবির শুটিং করতে গিয়ে যে রোমাঞ্চ এবং বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, আশা করি দর্শকরাও থিয়েটারে বসে সেই একই অনুভূতি পাবেন।” সত্যি বলতে, সুবর্ণ সেন শুধু একটি চরিত্র নয়, এটি এখন বাঙালির ঘরোয়া আবেগে পরিণত হয়েছে।
তারকাখচিত অভিযান: আবির, অর্জুন ও ঈশার রসায়ন
সোনাদা, আবির এবং ঝিনুক— এই তিনজনের বন্ধুত্বের রসায়নই ‘গুপ্তধন’ সিরিজের প্রাণ। অর্জুন চক্রবর্তী এবং ঈশা সাহা নিজেদের চরিত্রে এতটাই সাবলীল যে, তাদের ছাড়া এই সিরিজ ভাবাই যায় না। টিজারে তাদের দুজনের চেহারায় যেমন কৌতূহল দেখা গেছে, তেমনই রয়েছে বিপদের আশঙ্কা। অন্যদিকে, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের উপস্থিতি এই ছবিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার রহস্যময় ডায়লগ এবং গম্ভীর উপস্থিতি কি সোনাদার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না কি সাহায্য করবে, তা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে জল্পনা তুঙ্গে।
পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “গুপ্তধন ফ্র্যাঞ্চাইজি আমার হৃদয়ের খুব কাছে। প্রতাপাদিত্যের গুপ্তধনের কিংবদন্তি আমাদের এক বিশাল ক্যানভাস দিয়েছে কাজ করার জন্য। সুন্দরবনের রহস্য এই ছবিটিকে একটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পহেলা বৈশাখের মতো শুভ দিনে এই টিজার মুক্তি দিয়ে আমরা দর্শকদের সাথে এই আনন্দ ভাগ করে নিতে চেয়েছি।” পরিচালকের এই আত্মবিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে টিজারের প্রতিটি ফ্রেমে।
সিনেমাটি ১৫ই মে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। গরমের ছুটির সময় এই ধরণের একটি ফ্যামিলি অ্যাডভেঞ্চার ফিল্ম যে দর্শকদের হলে টানবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইতিহাসের পাঠ আর রহস্যের রোমাঞ্চ— দুইয়ের সংমিশ্রণে ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’ হয়ে উঠতে পারে বছরের অন্যতম ব্লকবাস্টার।
পরিশেষে বলা যায়, ‘সপ্তডিঙার গুপ্তধন’-এর টিজারটি রহস্য এবং গতির এক চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। এটি যতটা দেখিয়েছে, তার চেয়েও বেশি রহস্য দর্শকদের ভাবনার জন্য রেখে দিয়েছে। সুবর্ণ সেনের বুদ্ধির দীপ্তি আর সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মায়াজাল— এই দুইয়ের লড়াই দেখতে বাঙালি এখন চাতকের মতো চেয়ে আছে ১৫ই মে-র দিকে। পহেলা বৈশাখের এই সেরা উপহারটি নিঃসন্দেহে বাংলা সিনেমার দর্শকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। সোনাদার হাত ধরে ইতিহাসের আরও এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে ডুব দেওয়ার জন্য তৈরি থাকুন।






