ভারতের কৌশলগত মানচিত্রে ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডর এমন একটি অংশ, যেখান দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্য মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। প্রস্থ মাত্র ২০–২২ কিলোমিটার—এই সংকীর্ণ করিডরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ছিল।
সম্প্রতি সেই উদ্বেগ আরও বাস্তব রূপ পেয়েছে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা, মিয়ানমারের অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের সামরিক গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রের বড় সিদ্ধান্ত—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত কিন্তু পরিত্যক্ত হয়ে পড়া একাধিক এয়ারস্ট্রিপ আবার চালু করা হবে। লক্ষ্য একটাই: জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা মোতায়েন, রসদ পরিবহণ এবং আকাশপথে নজরদারি জোরদার করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধিই নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের কৌশলগত মানচিত্রই বদলে দিতে পারে।
কেন ‘চিকেনস নেক’ ভারতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর করিডর

শিলিগুড়ি করিডর শুধু একটি ভৌগোলিক পথ নয়, এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জীবনরেখা। সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ লাইন, গ্যাস পাইপলাইন—সবকিছুই এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল।
একদিকে নেপাল, অন্যদিকে বাংলাদেশ, উত্তরে ভুটান এবং আরও ওপরে চীন—চার দেশের ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি এই করিডরকে করে তুলেছে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য কোনও বিঘ্নেই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ ছিন্ন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক যুদ্ধে শুধু স্থলসেনা নয়, আকাশপথের নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই অঞ্চলে দ্রুত বিমান ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি করা কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি।
এই বাস্তবতা থেকেই পুরনো এয়ারস্ট্রিপগুলিকে নতুন প্রযুক্তিতে আধুনিক করে তোলার সিদ্ধান্ত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এয়ারস্ট্রিপ: ইতিহাস থেকে আধুনিক কৌশল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী উত্তর-পূর্ব ভারতে একাধিক এয়ারস্ট্রিপ তৈরি করেছিল। তখন এই অঞ্চল ছিল বার্মা ফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুদ্ধ শেষে সেগুলির অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
কালের নিয়মে কিছু এয়ারস্ট্রিপে গড়ে উঠেছে ঘাসে ঢাকা মাঠ, কোথাও আবার স্থানীয় চাষাবাদ। কিন্তু রানওয়ের মূল কাঠামো এখনও অনেক জায়গায় অক্ষত।
বর্তমান পরিকল্পনায় এই পুরনো কাঠামোগুলিকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক এয়ারস্ট্রিপ তৈরি করা হবে। ছোট ও মাঝারি সামরিক বিমান, পরিবহণ বিমান এবং প্রয়োজনে ফাইটার জেট ওঠানামার উপযোগী করে তোলা হবে এই ঘাঁটিগুলি।
এর ফলে নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমবে, সময় বাঁচবে এবং খরচও তুলনামূলকভাবে কম হবে—যা প্রশাসনিকভাবে বড় সুবিধা।
নিরাপত্তা ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক প্রভাব


এই এয়ারস্ট্রিপ পুনরুজ্জীবনের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছনো, চিকিৎসা পরিষেবা, এমনকি পর্যটন ক্ষেত্রেও এই এয়ারস্ট্রিপগুলি ভবিষ্যতে ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক ও বেসামরিক—দুই ধরনের ব্যবহারের জন্য ‘ডুয়াল ইউজ’ মডেল গড়ে তোলা হতে পারে।
এর ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে, পরিকাঠামো উন্নত হবে এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ কিছুটা হলেও কমবে।
তবে সমালোচকদের মতে, পরিবেশগত ভারসাম্য ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের নামে যেন প্রকৃতি বা সামাজিক কাঠামোর ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
চিকেনস নেক নিরাপত্তা জোরদারে পরিত্যক্ত WWII এয়ারস্ট্রিপ পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি যেমন উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের নতুন রাস্তা খুলে দিতে পারে।
তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের ওপর। সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।






