বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আসন্ন একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্মেলন ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে তিনি সভাপতিত্ব করলেন একটি উচ্চস্তরের পর্যালোচনা বৈঠকে, যেখানে ভারতের কৌশলগত প্রস্তুতি, অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বিশ্ব অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি এবং নিরাপত্তা কাঠামো একাধিক সংকট ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষাপট আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির একটি হিসেবে ভারত শুধু নিজের স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ফলে আসন্ন বৈশ্বিক কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেশের জন্য কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পর্যালোচনা বৈঠকের মাধ্যমে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে—আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবস্থান আরও সক্রিয়, আত্মবিশ্বাসী এবং লক্ষ্যভিত্তিক হতে চলেছে।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কূটনৈতিক প্রস্তুতির খুঁটিনাটি

এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রক, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দপ্তর, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নীতি সংশ্লিষ্ট শীর্ষ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার মূল কেন্দ্রে ছিল আসন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলিতে ভারতের অবস্থান কী হবে এবং কোন কোন ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সূত্র অনুযায়ী, বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শক্তি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা—এই পাঁচটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকগুলিকে নির্দেশ দেন, যাতে ভারতের বার্তা হয় সুসংহত, স্পষ্ট এবং কৌশলগতভাবে শক্তিশালী।
বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলির উপর। কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের বার্তা দেওয়া হবে, কোথায় নমনীয়তা এবং কোথায় দৃঢ়তা প্রয়োজন—এই সব বিষয় খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। কূটনৈতিক ভাষার পাশাপাশি নেপথ্যের প্রস্তুতিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই বৈঠক দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের উপস্থিতি আর প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং তা এখন প্রো-অ্যাকটিভ এবং ভবিষ্যৎমুখী।
বৈশ্বিক মঞ্চে ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার

পর্যালোচনা বৈঠকে উঠে আসে, আসন্ন আন্তর্জাতিক পর্বে ভারত মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর তার কূটনীতি গড়ে তুলতে চাইছে। প্রথমত, বহুপাক্ষিক মঞ্চে নেতৃত্ব—যেমন জি২০ এবং ব্রিকস—যেখানে ভারত উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ তুলে ধরতে চায়।
দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো গ্লোবাল সাউথ। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার। এই অঞ্চলের দেশগুলিকে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল স্রোতে আনার বার্তাই তুলে ধরতে চায় নয়াদিল্লি।
তৃতীয় স্তম্ভ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যৌথ লড়াই—এই বিষয়গুলিতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট এবং আপসহীন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনও ধরনের দ্বিধা থাকবে না।
এই তিনটি স্তম্ভ মিলিয়েই গড়ে উঠছে ভারতের সমসাময়িক বৈদেশিক নীতির কাঠামো, যা কেবল তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকেও সামনে রাখছে।
অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি: ভারতের সমন্বিত কূটনীতি

এই পর্যালোচনা বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিকে একসূত্রে গাঁথার কৌশল। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, আধুনিক কূটনীতি আর কেবল রাজনৈতিক বার্তায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ডিজিটাল সহযোগিতা।
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কার মধ্যেও ভারত নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়। উৎপাদন, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সাফল্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়।
নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সাইবার সিকিউরিটি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। উন্নত প্রযুক্তি ভাগাভাগি, যৌথ গবেষণা এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহযোগিতা—এই বিষয়গুলি ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সব মিলিয়ে, ভারতের কূটনীতি এখন বহুমাত্রিক—যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা চাহিদা এবং প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ একে অপরের পরিপূরক।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক স্পষ্ট করে দিল, আসন্ন বৈশ্বিক কূটনৈতিক পর্বে ভারত আত্মবিশ্বাসী ও সুপরিকল্পিত ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। বিশ্ব রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় ভারতের বার্তা হবে সুস্পষ্ট—সহযোগিতা, স্থিতিশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। এই প্রস্তুতি শুধু তাৎক্ষণিক সম্মেলনের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ভারতের বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার দিকেই এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।






