আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সন্ধ্যায় কলকাতা সাক্ষী থাকল এক বিশেষ চলচ্চিত্র-উৎসবের— বহুল প্রতীক্ষিত বাংলা ছবি “ফুল পিশি ও এডওয়ার্ড”–এর শুটিং শেষ হওয়ার আনন্দে আয়োজিত এক বর্ণময় সানডাউনার পার্টি। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত বিলাসবহুল পোলো ফ্লোটেলে অনুষ্ঠিত এই জমায়েতে উপস্থিত ছিলেন ছবির তারকা থেকে শুরু করে কলাকুশলীরা— সকলেই। আলো, সঙ্গীত, হাসি আর স্মৃতিচারণে ভরা এই সন্ধ্যা যেন ছবির যাত্রাপথের এক আবেগঘন মাইলফলক হয়ে রইল।
শুধু একটি wrap-up পার্টি নয়, এই অনুষ্ঠান ছিল নারী দিবসের আবহে নারীশক্তি, সৃজনশীলতা ও দলগত বন্ধনের এক অনন্য উদযাপন। ছবির নামের মতোই অনুষ্ঠানের পরিবেশে ছিল নস্টালজিয়া, আন্তরিকতা এবং এক ধরনের পারিবারিক উষ্ণতা। বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখদের পাশাপাশি তরুণ অভিনেতারাও উপস্থিত ছিলেন, যা প্রজন্মের মেলবন্ধনের এক সুন্দর ছবি তুলে ধরে।
ছবির প্রধান অভিনয়শিল্পী সোহিনী সেনগুপ্ত, রাইমা সেন, অর্জুন চক্রবর্তী, অনামিকা সাহা, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, শ্যামৌপ্তি মুদলি, ঋষভ বসু এবং সৌম্য মুখোপাধ্যায়— সবাই একসঙ্গে সময় কাটান, গল্প করেন, এবং শুটিংয়ের নানা মজার মুহূর্ত স্মরণ করেন। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, চিত্রগ্রাহক অনিমেষ ঘরুই, সঙ্গীত পরিচালক জয় সরকার, মেকআপ শিল্পী পাপিয়া চন্দা, কস্টিউম ডিজাইনার অনুপম রায় এবং শিল্প নির্দেশক মৃদুল ও সাস্বতী— ছবির পেছনের শক্তি হিসেবে পরিচিত এই দলটিও ছিলেন অনুষ্ঠানের কেন্দ্রে। তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, একটি চলচ্চিত্রের সাফল্য কেবল অভিনেতাদের নয়, পুরো টিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
তারকাদের উপস্থিতিতে নদীতীরের ঝলমলে সন্ধ্যা

সানডাউনার পার্টির জন্য পোলো ফ্লোটেল যেন একেবারে নতুন রূপে সেজে উঠেছিল। নদীর ওপরে সূর্যাস্তের কমলা আভা, হালকা বাতাস এবং স্নিগ্ধ আলো— সব মিলিয়ে এক সিনেম্যাটিক পরিবেশ তৈরি হয়। অতিথিরা যখন একে একে উপস্থিত হন, তখন লাল গালিচার আবহে তাঁদের স্বাগত জানানো হয়।
তারকাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে একেবারে গ্ল্যামারাস। অভিনেত্রী রাইমা সেনের স্টাইলিশ উপস্থিতি যেমন নজর কাড়ে, তেমনই সোহিনী সেনগুপ্তর পরিমিত সৌন্দর্য ও অনন্যা চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করে। অর্জুন চক্রবর্তী ও ঋষভ বসুও ছিলেন স্বাভাবিক কিন্তু স্মার্ট উপস্থিতিতে।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল— এখানে কোনও আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ আড্ডা। একসঙ্গে ছবি তোলা, হাসি-ঠাট্টা, স্মৃতিচারণ— সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল এটি যেন একটি পরিবারের মিলনমেলা। শুটিং শেষ হওয়ার স্বস্তি এবং একসঙ্গে কাজ করার আনন্দ— দুটোই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছিল সকলের আচরণে।
শুটিংয়ের অজানা গল্প ও মজার মুহূর্তে ভরা আড্ডা

সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ ছিল একটি র্যাপিড-ফায়ার সেশন, যেখানে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা শুটিংয়ের নানা মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। এই সেশনেই উঠে আসে বহু অজানা গল্প— কখনও হাসির, কখনও আবেগের।
পরিচালক নন্দিতা রায় মজার ছলে জানান, শুটিং চলাকালীন সবচেয়ে দুষ্টুমি করতেন রাইমা সেন। এই মন্তব্যে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন, আর রাইমাও হাসিমুখে তা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, পুরো ইউনিটের সঙ্গে কাজ করা ছিল অত্যন্ত আনন্দের, এবং সেটের পরিবেশ ছিল উষ্ণ ও সৃজনশীল।
রাইমা সেন বলেন, “এই ছবির অভিজ্ঞতা আমার কাছে খুবই বিশেষ। এত ভালো পরিবেশে কাজ করার সুযোগ খুব কমই পাওয়া যায়। আমরা সবাই যেন একটি পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছিলাম।” তাঁর এই মন্তব্য ছবির দলগত সম্পর্কের গভীরতাই প্রকাশ করে।
অন্য অভিনেতারাও জানান, ছবির গল্প এবং চরিত্রগুলো তাঁদের কাছে খুব কাছের হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করার ফলে যে বন্ধন তৈরি হয়, তা এই অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে।
পরিচালকদ্বয়ের আবেগঘন বক্তব্য ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা

পরিচালক নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রে মানবিক গল্প বলার জন্য পরিচিত। এই ছবিও যে তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা তাঁদের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নন্দিতা রায় বলেন, এই ছবিটি তাঁদের কাছে শুধুই একটি প্রজেক্ট নয়, বরং ভালোবাসার শ্রম। পুরো ইউনিটের একতা, নিষ্ঠা এবং পারস্পরিক সম্মান— এই ছবির শক্তি। তিনি মজার ছলে আবারও বলেন, “রাইমা সেটে দুষ্টুমি করে পরিবেশ প্রাণবন্ত রাখত।”
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যোগ করেন, একটি চলচ্চিত্র তৈরি করা মানে একটি দীর্ঘ যাত্রা— যেখানে আনন্দ, ক্লান্তি, চাপ এবং আবেগ সবই থাকে। এই যাত্রা শেষ হলেও, দর্শকের সামনে ছবিটি পৌঁছনোর অপেক্ষা এখন সবচেয়ে বড়।
তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকের কাছ থেকে একই রকম ভালোবাসা পাবে, যেমনটি তাঁরা শুটিং চলাকালীন অনুভব করেছেন।
“ফুল পিশি ও এডওয়ার্ড”–এর wrap-up উদযাপন শুধুমাত্র একটি পার্টি ছিল না; এটি ছিল একটি সৃজনশীল যাত্রার সমাপ্তি এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনা। নারী দিবসে এই উদযাপন ছবিটির ভাবনার সঙ্গে এক বিশেষ তাৎপর্য যোগ করে— যেখানে নারীর শক্তি, সম্পর্কের উষ্ণতা এবং মানবিকতার গল্প মিলেমিশে আছে।
কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এই অনুষ্ঠান নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিটি মুক্তির আগেই দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। যদি এই সন্ধ্যার আবহ ছবির প্রতিফলন হয়, তবে বলা যায়— “ফুল পিশি ও এডওয়ার্ড” বাংলা সিনেমার দর্শকদের জন্য এক হৃদয়ছোঁয়া অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে চলেছে।






