শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প অরেঞ্জ লাইন মেট্রো নতুন জটিলতায় পড়েছে। বিমানবন্দরের এক্সিট রোডে অস্থায়ী ট্রাফিক ব্লকের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল মেট্রো কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পুলিশ সেই প্রস্তাবে ‘না’ জানানোয় প্রকল্পের কাজ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
অরেঞ্জ লাইন মূলত বিমানবন্দরকে শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ করিডরের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যেই নির্মিত হচ্ছে। দ্রুত সংযোগ, যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্য এবং ট্রাফিক চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই শুরু হয়েছিল এই প্রকল্প। কিন্তু কাজের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্বন্দ্ব সামনে এল।
পুলিশের যুক্তি—বিমানবন্দর এক্সিট রোড অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ব্যস্ত। এখানে ট্রাফিক ব্লক করলে যাত্রী চলাচল, জরুরি পরিষেবা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
এই সিদ্ধান্তে প্রকল্পের সময়সীমা এবং ব্যয় দু’টিই বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শহরবাসীও এখন প্রশ্ন তুলছেন—অরেঞ্জ লাইনের ভবিষ্যৎ কী?
বিমানবন্দর এক্সিটে ট্রাফিক ব্লক কেন জরুরি ছিল?

মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি, অরেঞ্জ লাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পিয়ার ও গার্ডার বসানোর কাজের জন্য সাময়িক ট্রাফিক ব্লক প্রয়োজন ছিল। এই অংশটি সরাসরি বিমানবন্দর এক্সিট রোডের উপর দিয়ে যাবে। ফলে ভারী যন্ত্রপাতি বসানো এবং নিরাপদ নির্মাণকাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে যান চলাচল বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় ছিল না।
প্রকৌশলীদের মতে, রাতের বেলায় সীমিত সময়ের জন্য ব্লক করলে ঝুঁকি কমানো যেত। কিন্তু পুলিশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে—বিমানবন্দর এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই যাত্রী চলাচল থাকে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের সময়সূচি বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি ব্লক করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এছাড়া ভিআইপি মুভমেন্ট, অ্যাম্বুলেন্স চলাচল ও জরুরি পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে পুলিশ বিকল্প রুটের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে। সেই পরিকল্পনা এখনও সন্তোষজনক নয় বলেই সূত্রের খবর।
পুলিশের আপত্তির পেছনে নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা

পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দর সংলগ্ন রাস্তাগুলি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য ট্রাফিক জ্যামও কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি করতে পারে। ফলে নির্মাণকাজের জন্য রাস্তা বন্ধ রাখা মানেই ব্যাপক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা।
বিশেষ করে উৎসবের মরশুম, পর্যটনের শীর্ষ সময় কিংবা আবহাওয়া খারাপ থাকলে বিমানবন্দরের যাত্রীসংখ্যা বাড়ে। সেই সময় ট্রাফিক ব্লক করলে যাত্রীদের ফ্লাইট মিস করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দর এলাকায় যে কোনও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একাধিক দফায় অনুমোদন প্রয়োজন। সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা, নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রাখাই পুলিশের অগ্রাধিকার।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের ‘না’ বলাটা প্রশাসনিকভাবে অস্বাভাবিক নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ: সময়সীমা ও ব্যয়ের উপর প্রভাব

অরেঞ্জ লাইন মেট্রো প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা আগেই চাপের মুখে ছিল। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা—সব মিলিয়ে কাজ এগিয়েছে ধীরগতিতে। এখন নতুন করে ট্রাফিক ব্লকের অনুমতি না পাওয়ায় সময়সীমা আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
প্রকল্প বিলম্বিত হলে ব্যয়ও বাড়বে। নির্মাণ সামগ্রী, শ্রমিকের মজুরি এবং যন্ত্রপাতির খরচ সময়ের সঙ্গে বাড়তেই থাকে। অর্থাৎ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি পড়বে রাজ্যের অবকাঠামো উন্নয়ন বাজেটের উপর।
তবে মেট্রো কর্তৃপক্ষ আশাবাদী। তারা জানিয়েছে, বিকল্প প্রযুক্তিগত সমাধান এবং ধাপে ধাপে কাজের পরিকল্পনা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে। প্রয়োজনে রাতের গভীর সময়ে সীমিত পরিসরে কাজ করার প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
শহরের ট্রাফিক সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে অরেঞ্জ লাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে সমঝোতার পথ খুঁজবে বলেই আশা।
বিমানবন্দর এক্সিটে ট্রাফিক ব্লক নিয়ে পুলিশের আপত্তি অরেঞ্জ লাইন মেট্রো প্রকল্পকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি শহরের ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এই প্রকল্পও সমান জরুরি।
সমাধান নির্ভর করছে সমন্বয় ও পরিকল্পনার উপর। দ্রুত বিকল্প পথ বের করতে পারলে অরেঞ্জ লাইনের কাজ আবার গতি পাবে। নইলে বিলম্ব ও ব্যয়বৃদ্ধি—দুটিই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতে পারে।






