উত্তর দিনাজপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফের অগ্নিগর্ভ। ভোটার তালিকা সংশোধন ও বিশেষ নিবন্ধন (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। এই উত্তেজনাই শুক্রবার রূপ নিল হিংসায়—ব্লক অফিসে ঢুকে ভাঙচুর, সরকারি নথিতে আগুন এবং কর্মীদের আতঙ্কিত করে তোলার অভিযোগ উঠেছে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, দুপুরের দিকে আচমকাই একদল উত্তেজিত লোক ব্লক অফিস চত্বরে ঢুকে পড়ে। প্রথমে বিক্ষোভ, তারপরই ভাঙচুর শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যার ফলে নিরাপত্তা রক্ষীরা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা, এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক ফর্ম ও নথিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। ভোটার তালিকা আপডেটের মতো সংবেদনশীল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় এই ধরনের হামলা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে দোষারোপের পালা। শাসক ও বিরোধী—দুই পক্ষই একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে। প্রশাসন যদিও জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে, তবে ঘটনার জেরে এলাকায় টানটান উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে কেন এই উত্তেজনা

ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গে নতুন নয়। তবে এবারে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের মাত্রা অনেক বেশি। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণির নাম বাদ দেওয়া বা নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ শুরু হয়। উত্তর দিনাজপুরেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা দাবি করছেন, স্বচ্ছতা না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ জমছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ হচ্ছে। ভুল সংশোধনের জন্যই এসআইআর প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে, এর সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত নয়। তবুও মাঠপর্যায়ে কর্মরত আধিকারিকদের উপর চাপ ও হুমকির অভিযোগ বাড়ছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই শুক্রবারের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ভোটার তালিকার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে রাজনৈতিক সংঘাত কতটা বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।
ব্লক অফিসে হামলা ও এসআইআর ফর্মে আগুন

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একদল দুষ্কৃতী আচমকাই ব্লক অফিসে ঢুকে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর শুরু করে। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, কম্পিউটার ও আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কর্মীদের মধ্যে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক ফর্মে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ফর্মগুলিতে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য থাকার কারণে তথ্য সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনিক মহলের আশঙ্কা, এই ঘটনার ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ ব্যাহত হতে পারে।
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জের প্রয়োজন হয়নি বলে জানানো হলেও, এলাকায় অতিরিক্ত বাহিনী রাখা হয়েছে।
এই হামলার নেপথ্যে কারা, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
রাজনৈতিক তরজা ও প্রশাসনের কড়া বার্তা

হিংসার ঘটনার পরই রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে ওঠে। শাসক দলের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে প্রশাসনিক কাজ ভণ্ডুল করতে বিরোধীরা এই হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদের পাল্টা দাবি, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই বিক্ষোভের জন্ম, তার দায় প্রশাসন এড়াতে পারে না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা ও কর্মীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। আইন অনুযায়ী কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসন আরও জানিয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবেই চলবে। সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দিতে এবং শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে এই ধরনের ঘটনা রাজ্যের রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর আস্থা ফেরাতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দল—উভয়েরই দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।
উত্তর দিনাজপুরের ব্লক অফিসে ভাঙচুর ও এসআইআর ফর্ম পোড়ানোর ঘটনা শুধু একটি জেলার আইনশৃঙ্খলা সমস্যা নয়, বরং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা। ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহিংসতা সাধারণ মানুষের আস্থাকে নাড়িয়ে দেয়।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তার সমাধান হিংসা নয়। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সংযম এবং নাগরিক সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়েই এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। এখন দেখার, প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা দ্রুত উত্তর দিনাজপুরে শান্তি ফেরাতে পারে।






