হিন্দি ছবির মূলধারায় খুব কম অভিনেতাই আছেন, যাঁদের উপস্থিতি সিনেমার ভাষা বদলে দিয়েছে। নবাজুদ্দিন সিদ্দিকি ঠিক তেমনই এক নাম—যিনি নায়ক বা খলনায়কের ছাঁচে আটকে না থেকে চরিত্রকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তাঁর অভিনয় কখনও চিৎকার করে নজর কাড়ে না, বরং নিঃশব্দে দর্শকের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
বছরের পর বছর ধরে তিনি প্রমাণ করেছেন, অভিনয় মানে কেবল সংলাপ বলা নয়; অভিনয় মানে চরিত্রের শ্বাস-প্রশ্বাস হয়ে ওঠা। অনেক সময়ই বড় তারকাদের ভিড়ে তাঁর পারফরম্যান্স চোখ এড়িয়ে গেছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিই হয়ে উঠেছে কাল্ট।
Kahaani থেকে Talaash—এই সময়পর্বে নবাজুদ্দিন এমন কিছু চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেগুলো হয়তো বক্স অফিসের শিরোনাম দখল করেনি, কিন্তু ভারতীয় সিনেমার অভিনয়ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। আজ সেই পারফরম্যান্সগুলিকেই নতুন করে ফিরে দেখার সময়।
এই প্রতিবেদনে থাকছে নবাজুদ্দিন সিদ্দিকির এমন পাঁচটি অভিনয়, যেগুলো প্রমাণ করে কেন তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন, বরং একেকটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
Kahaani (2012): নীরব দৃঢ়তায় গড়া এক অফিসার


সুজয় ঘোষ পরিচালিত Kahaani মূলত বিদ্যা বালনের একক লড়াইয়ের গল্প হলেও, নবাজুদ্দিন সিদ্দিকির উপস্থিতি ছবিটিকে বাস্তবতার শক্ত মাটিতে দাঁড় করিয়ে দেয়। একজন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অফিসার হিসেবে তাঁর চরিত্রটি ছিল সংযত, হিসেবি এবং সন্দেহপ্রবণ।
নবাজুদ্দিন এখানে নায়ক হওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে সীমিত পরিসরেও চরিত্রকে স্মরণীয় করে তোলা যায়। তাঁর চোখের ভাষা, কথাবার্তার মিতব্যয়িতা এবং পরিস্থিতি বোঝার তীক্ষ্ণ ক্ষমতা গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে, শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য বড় স্ক্রিন টাইম প্রয়োজন হয় না—প্রয়োজন সঠিক উপস্থিতি।
Talaash: The Answer Lies Within (2012): সহানুভূতির এক নিঃশব্দ অধ্যায়


তালাশ এমন এক ছবি, যেখানে তারকার ভিড় ছিল চোখধাঁধানো। তবুও নবাজুদ্দিন সিদ্দিকির টেহমুর চরিত্রটি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক বঞ্চনা এবং নিঃসঙ্গতার ভার তিনি এমনভাবে বহন করেছেন, যা ব্যথা দেয় কিন্তু কৃত্রিম লাগে না।
এই চরিত্রে নবাজুদ্দিনের অভিনয় ছিল সম্পূর্ণ মানবিক। করুণার জন্য ভিক্ষা নয়, বরং নীরব কষ্টের মাধ্যমে সহানুভূতি আদায়। ছবির মূল রহস্যের সঙ্গে তাঁর চরিত্রের সংযোগ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর অভিনয়ের আবেগ।
এই পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করে, নবাজুদ্দিন সহ-অভিনেতা হয়েও পুরো ছবির অনুভূতির মানচিত্র বদলে দিতে পারেন।
Manjhi – The Mountain Man (2015): এক মানুষের জেদ ও ভালোবাসার ইতিহাস

Manjhi – The Mountain Man নবাজুদ্দিন সিদ্দিকির কাঁধেই ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছবি। দাশরথ মাঝির চরিত্রে তিনি কেবল অভিনয় করেননি, তিনি যেন চরিত্রটির জীবন যাপন করেছেন।
ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা, সমাজের অবহেলা এবং পাহাড় কেটে রাস্তা বানানোর অদম্য জেদ—সবকিছুতেই তাঁর অভিনয় ছিল কাঁচা, রুক্ষ এবং গভীরভাবে মানবিক।
এই ছবি দেখার পর দর্শক শুধু গল্প মনে রাখে না, মনে রাখে একজন মানুষের লড়াই। আর সেই লড়াইকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন নবাজুদ্দিন নিজেই।
Manto (2018): শিল্পী ও বিদ্রোহীর দ্বন্দ্ব

নন্দিতা দাস পরিচালিত Manto নবাজুদ্দিন সিদ্দিকির ক্যারিয়ারের এক মাইলফলক। সাদাত হাসান মন্তোকে তিনি কোনো কিংবদন্তি মূর্তি বানাননি, বরং একজন ত্রুটিপূর্ণ, সংবেদনশীল ও জেদি মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সংলাপ, শরীরী ভাষা এবং নীরবতায় নবাজুদ্দিন এমন এক শিল্পীকে গড়ে তুলেছেন, যিনি সমাজের মুখোশ খুলে দিতে ভয় পান না। তাঁর অভিনয়ে শিল্প ও জীবনের সীমারেখা মুছে যায়।
এই পারফরম্যান্স ভারতীয় সিনেমায় বায়োপিক কীভাবে করা উচিত, তার এক শক্ত উদাহরণ।
Thackeray (2019): রূপান্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা


Thackeray ছবিতে নবাজুদ্দিন সিদ্দিকি শুধু অভিনয় করেননি, তিনি সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়েছেন। বালাসাহেব ঠাকরের কণ্ঠস্বর, হাঁটাচলা, দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুই ছিল নিখুঁত পর্যবেক্ষণের ফল।
রাজনৈতিক মতাদর্শের বিতর্কের বাইরে দাঁড়িয়ে বিচার করলে, এই চরিত্রে তাঁর অভিনয় নিঃসন্দেহে সাহসী ও শ্রমসাধ্য। একজন বাস্তব জীবনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সহজ নয়, কিন্তু নবাজুদ্দিন সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।
এই ছবি তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি শক্ত প্রমাণ।
নবাজুদ্দিন সিদ্দিকির অভিনয় মানে কেবল বিনোদন নয়, বরং আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ। Kahaani থেকে Thackeray—এই পাঁচটি পারফরম্যান্স দেখায়, কীভাবে তিনি প্রতিটি চরিত্রকে আলাদা মানুষে রূপ দেন।
আজ যখন তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজেক্ট নিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা তুঙ্গে, তখন এই ছবিগুলিতে ফিরে তাকানো মানে তাঁর অভিনয়যাত্রার গভীরতা নতুন করে উপলব্ধি করা। নবাজুদ্দিন সিদ্দিকি তাই শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি ভারতীয় সিনেমার এক অমূল্য সম্পদ।






