ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে কেন্দ্র সরকার নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মাঝেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করলেন প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi।
এই বৈঠকে অর্থনৈতিক নীতির বর্তমান অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ এবং বিভিন্ন মন্ত্রকের পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অবকাঠামো, শিল্প, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই গতি আনার উপর জোর দিয়েছে কেন্দ্র।
সূত্রের খবর, বৈঠকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দেরি বরদাস্ত করা হবে না। দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রকল্প পর্যবেক্ষণ এবং ফলাফলভিত্তিক নীতির দিকে ঝুঁকছে সরকার।
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ভারত নিজেকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলির অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। সরকারের লক্ষ্য—শুধু পরিসংখ্যানগত বৃদ্ধি নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন।
অর্থনৈতিক সংস্কারে গতি: বৈঠকের মূল ফোকাস

এই পর্যালোচনা বৈঠকের কেন্দ্রে ছিল চলমান অর্থনৈতিক সংস্কারগুলির বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার মূল্যায়ন। উৎপাদন খাতে উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা (PLI) প্রকল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের অগ্রগতি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে নীতিগত সিদ্ধান্ত কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মাটির স্তরে তার প্রভাব পড়তে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) খাতে ঋণপ্রবাহ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং বাজার সংযোগ জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে আরও উঠে এসেছে রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের সমন্বয়ের বিষয়টি। উন্নয়ন প্রকল্পে বিলম্ব কমাতে কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ মেকানিজম আরও সক্রিয় করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে প্রত্যন্ত এলাকাতেও পৌঁছয়, সেটাই মূল লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের নিয়মিত পর্যালোচনা বৈঠক সরকারের “রিফর্ম-পারফর্ম-ট্রান্সফর্ম” নীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।
বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়নে নতুন জোর

বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিকাঠামো উন্নয়ন। সড়ক, রেল, বন্দর এবং লজিস্টিক্স—এই চার স্তম্ভকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন এবং সময়মতো কাজ শেষ করার উপর জোর দিয়েছেন।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণেও নতুন কৌশল নেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বৈঠকে বলা হয়েছে, নীতি স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ বজায় রাখাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে উৎপাদন খাতে প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো ও বিনিয়োগে এই সমান্তরাল জোর দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও ভারতের অর্থনৈতিক কৌশল

বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন ভারতের কৌশল কী হবে—তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি দামের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে শক্তিশালী রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকার মনে করছে, ডিজিটাল পেমেন্ট, সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। এই মডেলকে আরও বিস্তৃত করার নির্দেশও এসেছে।
ভারত যে শুধু নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করছে তাই নয়, বরং বৈশ্বিক মঞ্চে একটি দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছে—এই বার্তাও স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে।
উচ্চপর্যায়ের এই পর্যালোচনা বৈঠক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কেন্দ্র সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এখন কেবল একটি লক্ষ্য নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে। নীতি, বাস্তবায়ন এবং ফলাফল—এই তিনের সমন্বয়েই এগোতে চাইছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সংস্কার, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার যে রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনে ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত দেবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।






