পনেরো বছর—বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই সময়কাল কোনও ছোট অধ্যায় নয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় একের পর এক হিট, সমালোচকদের প্রশংসা এবং দর্শকের অটুট বিশ্বাস নিয়ে নিজেদের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন Nandita Roy ও Shiboprosad Mukherjee।
বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার বাজারে যেখানে ওঠাপড়া নিত্যদিনের ঘটনা, সেখানে ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু সম্পর্ক, সমাজ, পরিবার এবং আবেগকে কেন্দ্র করে নির্মিত তাঁদের ছবিগুলি প্রমাণ করেছে—‘কনটেন্ট-ড্রিভেন’ সিনেমাও বড় বক্স অফিস নম্বর তুলতে পারে।
মাল্টিপ্লেক্স কালচারের উত্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহুরে দর্শকদের মন জয় করা যেমন জরুরি ছিল, তেমনই মফস্বল ও গ্রামীণ বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এই দুই প্রান্তকে একই সুতোয় গেঁথে রেখেছে তাঁদের গল্প বলার ধরন।
১৫ বছরে তাঁদের ফিল্মোগ্রাফি শুধু সংখ্যায় নয়, প্রভাবেও সমৃদ্ধ। উৎসবের মরসুমে মুক্তি পাওয়া একাধিক ছবি ‘পুজো হিট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ফলে বাংলা ছবির বক্স অফিস বিশ্লেষণে তাঁদের নাম এখন এক নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড।
ধারাবাহিক বাণিজ্যিক সাফল্য: মাল্টিপ্লেক্স থেকে মফস্বল

বাংলা সিনেমার বাজারে গত এক দশকে মাল্টিপ্লেক্স চেইনের গুরুত্ব বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। শহুরে দর্শক এখন গল্পনির্ভর, প্রাসঙ্গিক ও আবেগঘন কনটেন্ট খোঁজেন। এই পরিবর্তিত দর্শকচাহিদাকে বুঝেই ছবির পরিকল্পনা করেছেন এই জুটি।
তাঁদের একাধিক ছবি জাতীয় মাল্টিপ্লেক্স চেইনে শক্তিশালী ‘ওপেনিং’ তুলেছে। শুধু প্রথম সপ্তাহ নয়, দীর্ঘ ‘রান’-এর ক্ষেত্রেও তাঁরা সাফল্য দেখিয়েছেন। মুখে মুখে প্রচার—‘ওয়ার্ড অফ মাউথ’—তাঁদের ছবির অন্যতম বড় শক্তি।
বিশেষ করে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলি প্রায় প্রতি বছরই বক্স অফিসে আলোড়ন তুলেছে। পারিবারিক আবহ, আবেগময় গল্প এবং উৎসবের আবেগ—এই সমীকরণ তাঁদের জন্য কার্যকর হয়েছে বারবার।
২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত Bohurupi পুজোর মাল্টিপ্লেক্স কালেকশনে রেকর্ড গড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। ট্রেড অ্যানালিস্টদের মতে, এটি বাংলা ছবির উৎসবকালীন বাণিজ্যিক সাফল্যের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে।
গল্পের শক্তি ও আবেগের সংযোগ: দর্শকের বিশ্বাসের ভিত্তি
নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সম্পর্কের সূক্ষ্মতা তুলে ধরা। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রজন্মের ফারাক, সামাজিক বাস্তবতা—সবকিছুকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় উপস্থাপন করেন তাঁরা।
এই মানবিক গল্প বলার ভঙ্গিই দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ তৈরি করেছে। দর্শক জানেন, তাঁদের ছবি মানেই এমন এক গল্প, যেখানে নিজস্ব জীবনের প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়।
সমালোচকদের মতে, এই জুটির সাফল্যের বড় কারণ হল বাণিজ্যিক ও বিষয়ভিত্তিক সিনেমার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা। শুধুমাত্র আর্টহাউস নয়, আবার কেবলমাত্র ‘ম্যাস এন্টারটেইনমেন্ট’ও নয়—বরং দুই ধারার মিলিত রূপ।
একাধিক ছবিতে সামাজিক বার্তা ও বিনোদনকে একসঙ্গে পরিবেশন করে তাঁরা দেখিয়েছেন—‘কনটেন্ট ইজ কিং’ শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব।
উৎসব, ব্র্যান্ড ও ট্রেড ইমপ্যাক্ট: ১৫ বছরে এক নির্ভরযোগ্য নাম

বাংলা ছবির ক্ষেত্রে দুর্গাপুজো একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘বক্স অফিস উইন্ডো’। এই সময়ে বড় মুক্তি মানেই উচ্চ প্রত্যাশা। নন্দিতা-শিবপ্রসাদ জুটি সেই প্রত্যাশাকে বারবার পূরণ করেছেন।
ট্রেড সার্কেলে তাঁদের নাম মানেই নিরাপদ বিনিয়োগ—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। প্রযোজক ও পরিবেশকদের কাছে এটি বড় আস্থা। কারণ ধারাবাহিকভাবে ভালো কালেকশন তোলা মানে বাজারে স্থায়িত্ব।
তাঁদের ছবি প্রায়ই ‘রিপিট ভিউয়িং’-এর সুযোগ তৈরি করে। পরিবার নিয়ে একাধিকবার প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার প্রবণতা বক্স অফিস আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে।
এই ১৫ বছরে তাঁদের যাত্রা কেবল সাফল্যের তালিকা নয়; বরং আঞ্চলিক চলচ্চিত্র শিল্পে টেকসই ব্র্যান্ড গড়ে তোলার এক উদাহরণ।
১৫ বছরের পথচলায় Nandita Roy ও Shiboprosad Mukherjee প্রমাণ করেছেন—শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত গল্পই শেষ পর্যন্ত দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
বক্স অফিস নম্বর, মাল্টিপ্লেক্স কালেকশন, পুজো হিট—সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাঁদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হল বিশ্বাস। দর্শকের বিশ্বাস, ট্রেডের আস্থা এবং বিষয়নির্ভর সিনেমার ধারাবাহিকতা।
বর্তমান গতিপথ যদি ইঙ্গিত দেয়, তবে বলা যায়—এই বক্স অফিস যাত্রা এখনও অনেক দূর যাওয়ার বাকি। নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য তাঁদের পথচলা এক অনুপ্রেরণা, আর বাংলা সিনেমার জন্য এক শক্ত ভিত।






