ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে দুই নাম বরাবর আলাদা মর্যাদা পেয়ে এসেছে—মিতালি রাজ ও বিরাট কোহলি। একজন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের সবচেয়ে স্থির ও ধারাবাহিক স্তম্ভ, অন্যজন পুরুষ ক্রিকেটের আধুনিক যুগের ব্যাটিং আইকন। দু’জনই নিজেদের সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে এক বিশেষ বিষয়—২৩২টি ওয়ানডে শেষে দু’জনের ব্যাটিং পরিসংখ্যান কেমন ছিল? পরিসংখ্যানের বিস্তৃতি যতই বৃহৎ হোক, তুলনার জন্য নির্দিষ্ট ম্যাচসংখ্যা বেছে নেওয়া সবসময়ই ফ্যানদের কাছে আকর্ষণীয়। কারণ, এতে পরিষ্কার বোঝা যায় কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটাররা ধীরে ধীরে কিংবদন্তির খেতাব অর্জন করতে শুরু করেছিলেন।
মিতালি রাজ ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে পাথরের মতো স্থিরতা এনেছেন। টপ অর্ডারে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাটিং করে দলকে ভরসা দেওয়ার কাজটি তিনি অতুলনীয়ভাবে করেছেন। অন্যদিকে, বিরাট কোহলি পুরুষদের ক্রিকেটে রান-মেশিন হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন তাঁর ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়েই। ফলে ২৩২টি ওয়ানডে শেষে দুই তারকার পরিসংখ্যান ক্রিকেটপ্রেমীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে—ধারাবাহিকতার দিক থেকে কে এগিয়ে ছিলেন?
এই প্রতিবেদন তাই দুই কিংবদন্তির এই বিশেষ পর্যায়ের রেকর্ড বিশ্লেষণ করবে, তুলনা করবে রান, গড়, স্ট্রাইক রেট, সেঞ্চুরি–হাফ সেঞ্চুরির মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাশাপাশি দেখাবে—পরিসংখ্যানের বাইরে দু’জন কেনই বা আলাদাভাবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন।
মিতালি রাজের ২৩২টি ওয়ানডে শেষে পরিসংখ্যান

মিতালি রাজের ২৩২তম ওয়ানডে ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অপেক্ষাকৃত পরিণত সময়। তখন পর্যন্ত মহিলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি ছিলেন ‘স্ট্যান্ডার্ড সেটার’। টপ অর্ডার ব্যাটার হিসেবে তিনি ভারতের স্কোরবোর্ডকে ধরে রাখতেন অভ্যেসের মতো।
২৩২ ম্যাচ শেষে মিতালির প্রাপ্তি:
- মোট রান: প্রায় ৭,৪০০+
- ব্যাটিং গড়: ৫০+
- হাফ সেঞ্চুরি: ৬০+
- সেঞ্চুরি: ৭
- স্ট্রাইক রেট: ৭০-এর আশেপাশে
মিতালির ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তাঁর অসাধারণ ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৫০+ গড় বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু মহিলা ক্রিকেটে এত দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরও এমন উচ্চমান বজায় রাখা আরও কঠিন।
তাঁকে ‘রান-মেশিন’ বলা হয় না শুধুমাত্র রানের জন্য, বরং দলের প্রেক্ষাপটে তাঁর সামগ্রিক অবদানের জন্য। মেয়েদের ক্রিকেটে রান সংগ্রহ করা ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং—কম ম্যাচ, কম সুবিধা, কম প্রস্তুতি। তবুও মিতালি রাজ এই ফ্রেমে ৫০+ গড় ধরে রেখেছেন।
এছাড়া তাঁর ৬০টিরও বেশি হাফ সেঞ্চুরি দেখিয়ে দেয়—ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের স্তম্ভ হয়ে ওঠা ছিল সময়ের দাবি, আর মিতালি সেই জায়গাটি পূরণ করেছেন নিখুঁতভাবে।
বিরাট কোহলির ২৩২টি ওয়ানডে শেষে পরিসংখ্যান

বিরাট কোহলি যখন ২৩২তম ওয়ানডে ম্যাচ খেলেন, তিনি তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর রান সংগ্রহ, সেঞ্চুরি তৈরির দক্ষতা এবং মধ্যম–শেষ ওভারে চাপ সামলানোর ক্ষমতা তাঁকে আলাদা শ্রেণিতে পৌঁছে দিয়েছিল।
২৩২ ম্যাচ শেষে কোহলির প্রাপ্তি:
- মোট রান: ১১,০০০+
- ব্যাটিং গড়: ৫৮+
- হাফ সেঞ্চুরি: ৫০+
- সেঞ্চুরি: ৪১
- স্ট্রাইক রেট: ৯৩–৯৫
এই পরিসংখ্যান দেখে বোঝাই যায়—কোহলি তাঁর ২৩২ ম্যাচ শেষে এমন অবস্থানে পৌঁছে ছিলেন, যেখানে তাঁকে থামানোই তখনকার প্রতিপক্ষের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর সেঞ্চুরির সংখ্যা নিজেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
স্ট্রাইক রেট ৯৫-এর কাছাকাছি থাকা মানে তিনি শুধু রান করতেন না, রান করতেন ম্যাচ জেতানোর গতিতে। পুরুষদের ওয়ানডে ক্রিকেটে ১১ হাজার রান অর্জন করা ২০০টির মধ্যেই বিরল বিষয়; সেখানে কোহলি ২৩২ ম্যাচেই পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করেছিলেন—তিনি আধুনিক ক্রিকেটের মহাতারকা।
মধ্য ওভারে স্ট্রাইক রোটেশন, দৌড়ে রান নেওয়ার দক্ষতা এবং শেষ দিকে গিয়ার বাড়ানোর ক্ষমতা তাঁকে দলের অপরিহার্য মেরুদণ্ডে পরিণত করে।
মিতালি বনাম কোহলি—২৩২ ম্যাচের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ

দু’জনের পরিসংখ্যান তুলনা করা মানে দুই আলাদা যুগ, আলাদা পরিপ্রেক্ষিত ও আলাদা চাপের তুলনা করা। তবুও নির্দিষ্ট সংখ্যায় তাদের দাঁড় করালে পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়।
১. রান সংগ্রহ
কোহলির রান মিতালির তুলনায় অনেক বেশি। এর কারণ—পুরুষদের ক্রিকেটে ম্যাচসংখ্যা অনেক বেশি, এবং রান করার গতি তুলনামূলক দ্রুত।
২. ব্যাটিং গড়
দু’জনেরই ব্যাটিং গড় অসাধারণ। কিন্তু মিতালির ৫০+ গড় মহিলা ক্রিকেটের পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও প্রশংসনীয়। কোহলির ৫৮+ গড় সন্দেহ নেই—পুরুষদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা।
৩. সেঞ্চুরি ও হাফ সেঞ্চুরি
কোহলির সেঞ্চুরি সংখ্যার কাছে ইতিহাসও মাথা নত করে। কিন্তু মিতালির ৬০+ হাফ সেঞ্চুরি দেখিয়ে দেয়—তিনি ম্যাচ ধরে রাখার প্রধান কারিগর ছিলেন।
৪. স্ট্রাইক রেট
কোহলির স্ট্রাইক রেট অনেক বেশি, যা আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মিতালির স্ট্রাইক রেট তুলনামূলক কম হলেও তাঁর ভূমিকা ছিল অ্যাঙ্কর হিসেবে, যা দলের কৌশলের সঙ্গে মানানসই।
৫. দলের ওপর প্রভাব
মহিলা ক্রিকেটে মিতালি রাজের অবদান হচ্ছে—ভারতীয় ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করার নেতৃত্ব।
অন্যদিকে কোহলি ভারতীয় পুরুষ দলের ‘উইনিং মেন্টালিটি’কে এগিয়ে নিয়ে গেছেন অন্য মাত্রায়।
২৩২টি ওয়ানডে শেষে মিতালি রাজ এবং বিরাট কোহলির পরিসংখ্যান তুলনা করলে বোঝা যায়—দু’জনই নিজেদের ক্ষেত্রে একেবারে অনন্য। কোহলি পুরুষদের ক্রিকেটে ব্যাটিং-দৈত্য হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। আর মিতালি মহিলা ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার এমন মান তৈরি করেছেন, যা নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কাছে প্রেরণা।
অতএব, সংখ্যা দিয়ে তুলনা করা সম্ভব হলেও দু’জনেরই বিশেষত্ব ভিন্ন। একজন রানমেশিন, অন্যজন ইম্মুভেবল অ্যাঙ্কর—দু’জনই ভারতীয় ক্রিকেটকে আজ যে উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।






