শনিবার রাতটা ইতিহাস হওয়ার কথা ছিল। ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির নাম, উন্মাদনা আর আলোয় ভরে উঠেছিল গোটা স্টেডিয়াম। কিন্তু প্রত্যাশার সেই উৎসব মুহূর্ত শেষ পর্যন্ত রূপ নিল বিশৃঙ্খলা, হতাশা ও ভাঙচুরের এক অন্ধকার অধ্যায়ে।
রবিবার সকাল হতেই স্টেডিয়ামের ভেতরের দৃশ্য বদলে দিল গোটা আখ্যান। সারি সারি প্লাস্টিকের চেয়ার ভাঙা, মোচড়ানো, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে মাঠ ও গ্যালারির চারপাশে। যেগুলো একদিন আগে দর্শকদের বসার জায়গা ছিল, সেগুলিই হয়ে উঠেছে ক্ষতির সবচেয়ে দৃশ্যমান চিহ্ন।
এই ভাঙচুরের আর্থিক মূল্যও কম নয়। স্টেডিয়ামে অস্থায়ী আসন সরবরাহকারী সংস্থার দাবি, শুধুমাত্র চেয়ার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতেই প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। মেসিকে এক ঝলক দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে যে উন্মাদনার জন্ম হয়েছিল, সেটাই শেষ পর্যন্ত পরিণত হল এক ‘Messi Meltdown’-এ।
ঘটনার অভিঘাত শুধু আর্থিক নয়। প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা ও আয়োজকদের প্রস্তুতি নিয়েও। ফুটবল প্রেমীদের স্বপ্নের রাত কেন এমনভাবে ভেঙে পড়ল, সেই উত্তর খুঁজছে গোটা শহর।
ভাঙচুরের চিহ্ন: রবিবার সকালে স্টেডিয়ামের করুণ ছবি
রবিবার সকালে স্টেডিয়ামে ঢুকতেই যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা অনেকটাই যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। হাজার হাজার প্লাস্টিকের চেয়ার উপড়ে ফেলা হয়েছে, অনেকগুলো ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে। কোথাও কোথাও চেয়ারের লোহার ফ্রেম বেঁকে গেছে, আবার কোথাও গ্যালারির সিঁড়িতে স্তূপ করে রাখা ভাঙা আসন।
সরবরাহকারী সংস্থার এক কর্তা জানান, এই চেয়ারগুলো বিশেষভাবে ইভেন্টের জন্য আনা হয়েছিল। প্রতিটির দাম, পরিবহণ, বসানো ও খোলার খরচ মিলিয়ে ক্ষতির অঙ্ক দ্রুত বেড়েছে। তাঁর কথায়, “এটা শুধু চেয়ার ভাঙার বিষয় নয়। গোটা লজিস্টিক সিস্টেমটাই ধাক্কা খেয়েছে।”
চেয়ারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যারিকেড, অস্থায়ী রেলিং ও প্রবেশপথের কিছু অংশ। দর্শকদের ভিড় একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এই ভাঙচুর শুরু হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
৫০ লক্ষ টাকার ক্ষতির হিসেব: সরবরাহকারী সংস্থার বক্তব্য

সরবরাহকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী, প্রায় ২০–২৫ হাজার অস্থায়ী চেয়ার বসানো হয়েছিল। তার মধ্যে একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। প্রতিটি চেয়ারের গড় মূল্য, পরিবহণ ও সেটআপ খরচ ধরলে ক্ষতির অঙ্ক ৫০ লক্ষ ছাড়িয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
সংস্থার এক সিনিয়র ম্যানেজার বলেন, “আমরা আগে অনেক বড় ইভেন্টে কাজ করেছি। কিন্তু এমন মাত্রার ভাঙচুর খুবই বিরল। চেয়ার ভাঙার পাশাপাশি আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল।”
এই ক্ষতির দায় কার—সেই প্রশ্ন এখনও খোলা। আয়োজক সংস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা দল এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনি পথে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কথাও ভাবছে সরবরাহকারী সংস্থা।
উন্মাদনা থেকে বিশৃঙ্খলা: কোথায় ব্যর্থ হল ব্যবস্থাপনা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার মূল কারণ একাধিক স্তরে ব্যর্থতা। প্রথমত, মেসির মতো বিশ্বতারকার উপস্থিতি মানেই জনসমুদ্র। সেই তুলনায় নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দ্বিতীয়ত, দর্শকদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক। মেসিকে খুব কাছ থেকে দেখার আশা, অনুষ্ঠান নিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা এবং শেষ মুহূর্তে কর্মসূচি ভেস্তে যাওয়ার গুঞ্জন—সব মিলিয়ে উত্তেজনা দ্রুত রূপ নেয় ক্ষোভে।
একজন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞের মন্তব্য, “এ ধরনের হাই-প্রোফাইল ইভেন্টে শুধু নিরাপত্তার সংখ্যা বাড়ালেই হয় না। দর্শক ব্যবস্থাপনা, স্পষ্ট যোগাযোগ এবং বিকল্প পরিকল্পনা—সবকিছু সমান জরুরি।”
‘Messi Meltdown’ শুধু একটি ইভেন্টের ব্যর্থতা নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশ্বতারকাদের ঘিরে উন্মাদনা যেমন বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করে, তেমনই সামান্য পরিকল্পনার ঘাটতি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
স্টেডিয়ামের ভাঙা চেয়ারগুলো এখন কেবল ক্ষতির হিসেব নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতীক। আগামী দিনে এমন ইভেন্ট সফল করতে হলে নিরাপত্তা, স্বচ্ছ যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল আয়োজন—এই তিনের সমন্বয়ই একমাত্র পথ।






