মালদহের কালিয়াচক যেন আবারও অস্থির। মঙ্গলবারের পর বুধবারও একই চিত্র—টানা গুলির শব্দে থরহরি কম্প যাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে, তাদের কাছে আর নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশাসনের কাছে এটি স্পষ্ট ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। দুই দিন ধরে পরপর আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার স্থানীয় মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, আর উঠেছে নতুন করে পুলিশি অদূরদর্শিতার অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে এলাকার দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ চরমে ওঠে। সেই উত্তেজনার রেশ এখনও কাটেনি। বুধবার সকালে হঠাৎই ফের গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে কালিয়াচক। স্থানীয়রা জানান, তিন থেকে চার রাউন্ড গুলির আওয়াজ শোনা যায়। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে উত্তেজনা ও আতঙ্কের নতুন অধ্যায়।
এই ক্রমাগত অশান্তি শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, প্রশাসনকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—যেখানে বুধবার সকাল থেকেই পুলিশি নজরদারি থাকার কথা, সেখানে কীভাবে ফের অস্ত্রবাজরা দাপট দেখাতে সফল হল? নিরাপত্তার ছিদ্র কোথায়?
ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ নাগরিক। এলাকার প্রবীণরা বলেছেন, “এভাবে যদি দু’দিন ধরে গুলি চলে, তবে পুলিশ আসলে করছে কী?” এই সরল প্রশ্নই বর্তমানে প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে কঠিন।
সংঘর্ষের উৎস: কোথা থেকে শুরু হল উত্তেজনা?
কালিয়াচকের অস্থিরতার মূলে রয়েছে প্রভাব বিস্তার ও পুরোনো বিবাদের মিশেল। মঙ্গলবার রাতের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় স্থানীয় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বচসা থেকে। সেই বিবাদই পরে রূপ নেয় মারামারি ও গুলির ঘটনায়। প্রশাসনের দাবি, এটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়, বরং দুষ্কৃতী-চক্রের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বলে মানতে নারাজ। অনেকের মত—প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়া ছাড়া নিতান্ত সাধারণ দুষ্কৃতীরা লাগাতার গুলি চালানোর সাহস পায় না। তাদের মতে, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভাবেই এসব দাপট বাড়ছে।
এলাকার ব্যবসায়ীরাও একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গুলির ঘটনার পর বাজার এলাকা প্রায় জনশূন্য। অনেকে দোকানই খোলেননি। স্কুলগামী শিশুর অভিভাবকরাও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় রাত জাগছেন।
পুলিশের ভূমিকা: নজরদারির ঘাটতি না পরিকল্পনার অভাব?

স্থানীয় প্রশাসন দাবি করেছে, মঙ্গলবারের ঘটনার পর থেকেই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব ছবিটি অন্য কথা বলে। বুধবার সকালে যখন ফের গুলি চালানো হয়, তখন নাকি পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করছিল। এই ‘টাইম গ্যাপ’-এর সুযোগ নিয়েই দুষ্কৃতীরা হামলা চালায়, অভিযোগ বাসিন্দাদের।
কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগ সরাসরি মানতে নারাজ পুলিশ। তাদের বক্তব্য—এলাকার গলি-ঘুপচি এতটাই জটিল যে প্রতিটি জায়গায় স্থায়ী মোতায়েন রাখা অসম্ভব। তবে তারা আরও জানায়, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে এখানেই প্রশ্ন—ইতিমধ্যেই উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও কেন ড্রোন নজরদারি বা মোবাইল টহল জোরদার করা হল না? স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের কৌশলগত ব্যর্থতাই পরিস্থিতিকে আরও ভয়ানক করেছে।
## সাধারণ মানুষের ভয়, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিতর্ক (H2)

কালিয়াচকের বাসিন্দারা এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। রাত নামলেই ভয় বাড়ছে। গুলির ঘটনার পর বহু পরিবার ইতিমধ্যে আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত অনেকেই এলাকায় ফিরতে চাইছেন না।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে—রাজ্যে পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তাদের বক্তব্য, “প্রতিদিন গুলি, বোমা, দাঙ্গা—এ কি আইন-শৃঙ্খলার চিত্র?” শাসকদলের পাল্টা দাবি, “প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। বিরোধীরা অযথা পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক রং দিচ্ছে।”
সামাজিক কর্মীরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে কালিয়াচকে অপরাধ চক্রের যেভাবে দাপট বেড়েছে, তা ভাঙতে হলে নিরপেক্ষ ও কড়া আইন প্রয়োগ ছাড়া উপায় নেই। শুধু মুহূর্তের টহল বা অস্থায়ী নজরদারি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
মালদহের কালিয়াচকে টানা দুই দিন ধরে গুলির ঘটনা শুধু একটি এলাকার সমস্যাই নয়; এটি গোটা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আর সেই জায়গাতেই যদি প্রশাসন ব্যর্থ হয়, তাহলে যে কোনও মুহূর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
প্রশাসনের উচিত দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি, অপরাধচক্রের শিকড় খুঁজে ধারাবাহিক অভিযান চালানো এবং স্থানীয় মানুষের আস্থা ফিরে আনা। নইলে কালিয়াচকের এই আতঙ্ক রাজ্যের অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না।






