সম্প্রতি অনুষ্ঠিত TOIFA 2025-এ যখন বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল, সেই মুহূর্তে এক নবাগত অভিনেতার নামই যেন সবচেয়ে আলোড়ন তুলেছিল—জুনাইদ খান। তাঁর প্রথম OTT ওয়েব ফিল্ম মহারাজ–এ অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি জিতে নিলেন ডেবিউ অ্যাক্টর অফ দ্য ইয়ার সম্মান। এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং তাঁর নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্তের যথাযথ স্বীকৃতি।
আপাতদৃষ্টিতে বলিউডে স্টার কিডদের ডেবিউ মানেই রোমান্টিক, ঝলমলে কোনও কমার্শিয়াল ছবি। কিন্তু আমির খানের পুত্র জুনাইদ খান স্রোতের বিপরীতেই হাঁটলেন। তিনি বেছে নিলেন ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়—মহারাজ লিবেল কেস (১৮৬২)—নিয়ে নির্মিত, গাঢ় সামাজিক-রাজনৈতিক সুরে মোড়া ড্রামা মহারাজ (২০২4)। এই সাহসী সিদ্ধান্তই তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করে দিল।
ফিল্মটিতে তিনি রূপ দিয়েছেন কবরেজি সমাজের অন্ধ বিশ্বাস ও ধর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শোষণের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া সমাজসংস্কারক কারসানদাস মুলজিকে। নবাগত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অভিনয়ের দৃঢ়তা, উচ্চারণের স্বচ্ছতা ও চরিত্রের গভীরতা দ্রুতই নজর কেড়েছে সমালোচক ও দর্শকদের।
এই প্রজেক্টের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে—জুনাইদ শুধু তারকা-পুত্রের আলোয় আসেননি; তিনি চলচ্চিত্রকে দেখেন এক দায়িত্ব, এক গভীর শিল্পচর্চা হিসেবে। তাঁর কথায়, এই ছবি তৈরির যাত্রা ছিল “long and wild,” কিন্তু এর প্রতিটি মুহূর্তই তাঁকে গড়ে তুলেছে আরও পরিণত শিল্পী হিসেবে।
জুনাইদের সাহসী সিদ্ধান্ত: কেন মহারাজ ছিল অপ্রথাগত ডেবিউ
বলিউডে প্রচলিত রাস্তা হল—হালকা রোমান্টিক গল্পে নাচ-গানের ভরপুর কোনও ছবি দিয়ে শুরু করা। কারণ এতে ঝুঁকি কম, জনপ্রিয়তা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু মহারাজ ছিল সম্পূর্ণ উল্টো পথ। এটি এক ঐতিহাসিক আদালত-ড্রামা, যা বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরের শোষণ, দুর্নীতি ও নারী নির্যাতনের অন্ধকার তুলে ধরেছে।
এই বিষয়বস্তু নবাগত অভিনেতার জন্য খুব সহজ ছিল না। চরিত্রটির রাজনৈতিক গুরুত্ব, সামাজিক দায়িত্ব, ইতিহাসের প্রেক্ষাপট—সব মিলিয়ে নির্মাণের চাপ ছিল প্রচুর। কিন্তু এখানেই ফুটে উঠেছে জুনাইদের পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি জানতেন, এ ধরনের চরিত্র তাঁর জন্য জনপ্রিয়তার শর্টকাট নয়; বরং দক্ষতা প্রমাণের এক কঠিন পরীক্ষাগার।
এই ঝুঁকি নেওয়ার মানেই ছিল—জুনাইদ কমফোর্ট জোনে থাকতে চান না। তিনি এমন গল্প বলতে চান যা সমাজে আলোচনার খোরাক জোগায়, যা দর্শকের মনকে ঝাঁকুনি দেয়, যা মহৎ সাহসিকতার পরিচয় বহন করে। তাঁর ডেবিউ সিদ্ধান্ত আসলে নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে এক বার্তা: শিল্পের শক্তি কেবল বিনোদনে নয়, পরিবর্তনের ইন্ধন জোগাতেও।
কারসানদাস মুলজিকে জীবন্ত করে তোলা: অভিনয়ের দীপ্তি

কারসানদাস মুলজি শুধু একজন সাংবাদিক বা সমাজসংস্কারকই ছিলেন না—তিনি ছিলেন এমন এক তরুণ যিনি সত্যের জন্য লড়েছিলেন ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। এমন চরিত্র ফুটিয়ে তোলা কোনও অভিজ্ঞ অভিনেতার জন্যও চ্যালেঞ্জিং; সেখানে জুনাইদের পারফরম্যান্স ছিল আশ্চর্যজনকভাবে পরিণত।
সমালোচকরা বিশেষ করে প্রশংসা করেছেন—
- তাঁর চোখের ভাষায় চরিত্রের দৃঢ়তা,
- ডায়ালগ ডেলিভারির স্বচ্ছতা,
- আবেগ প্রকাশের সূক্ষ্মতা,
- ও আদালত কক্ষের দৃশ্যগুলিতে তাঁর অটল আত্মবিশ্বাস।
এমনকি কঠিন মনোলগে তিনি যে স্বচ্ছন্দ, তা দেখে অনেকেই বলেছেন—জুনাইদ স্ক্রিনে যেন নতুন বাতাস। কোনও স্টার কিডের ভরসা নয়, বরং নিজের পরিশ্রমেই তিনি জায়গা করে নিয়েছেন।
ফিল্মটির পরিচালক ও টিমও বলেছেন, জুনাইদ চরিত্র বুঝতে ইতিহাসের নথি পড়েছেন, মুলজির লেখাগুলো অধ্যয়ন করেছেন এবং প্রতিটি দৃশ্যে বাস্তবতার অনুভূতি আনার চেষ্টা করেছেন। এই নিষ্ঠাই তাঁকে করিয়েছে আলাদা।
মহারাজ যে বার্তা তুলে ধরেছে—এবং কেন জুনাইদের পথচলা আরও গুরুত্বপূর্ণ
মহারাজ এমন এক চলচ্চিত্র যা বিনোদনের বাইরে গিয়ে দর্শককে সমাজের ন্যায়বিচার, নারীর মর্যাদা এবং ধর্মীয় প্রভাবের অপব্যবহার নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। সিনেমাটি দেখায়—কীভাবে কোনও ধর্মগুরু নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে নারীদের শোষণ করছিলেন এবং কীভাবে এক তরুণ সত্যের জন্য সেই প্রভাবশালী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
জুনাইদ এই গল্পে অভিনয় করে শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এমন এক বিষয় বেছে নিয়েছেন যা আজও প্রাসঙ্গিক—অন্ধ ভক্তি, অযৌক্তিক রীতিনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অস্বচ্ছতা। এ ধরনের কনটেন্টে নবাগতরা সাধারণত পা বাড়াতে চান না, কারন এতে বিতর্কের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু জুনাইদ ঝুঁকি নিলেন, এবং যথার্থভাবেই তাঁর এই সাহসই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিল।
সিনেমার সাড়া দেখে স্পষ্ট—দর্শকরা এখন গভীর কনটেন্টকে আগের চেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছেন। আর জুনাইদের এই বেছে নেওয়ার ক্ষমতা জানান দেয়, তিনি কেবল স্টারডমের পথে নয়, বরং অর্থবহ গল্পের পথেই হাঁটতে চান।
জুনাইদ খানের মহারাজ—এন্ট্রি কেবল একটি ডেবিউ নয়, বরং বলিউডে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচনের মুহূর্ত। তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, যে ঐতিহাসিক দায়িত্বকে শিকার করেছেন, তা নবাগতদের জন্য এক অনুপ্রেরণা। সমালোচক ও দর্শকদের প্রশংসা প্রমাণ করে—তিনি সঠিক পথই বেছে নিয়েছেন।
এখন শিল্পীমহলে একটাই কৌতূহল—এরপর কী? মহারাজ–এর মতো জটিল, দায়িত্বপূর্ণ চরিত্রে সাফল্যের পর তাঁর পরবর্তী প্রজেক্ট নিয়ে প্রত্যাশার মাত্রা আকাশছোঁয়া। কিন্তু যেটুকু স্পষ্ট, এই তরুণ অভিনেতা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছেন—তিনি নিজের পথ নিজেই তৈরি করবেন, এবং সেটি হবে গভীরতা, সূক্ষ্মতা ও মানবিক গল্পে পরিপূর্ণ।






