কলকাতা, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। টিজার এবং একের পর এক গানের মুক্তির পর থেকেই দর্শকমহলে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘লহো গৌরাঙ্গের নাম রে’। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। কলকাতায় আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পেল ছবির অফিসিয়াল ট্রেলার। বড়দিনে, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগে এই ট্রেলার যেন ছবির আবেগ, দর্শন ও শিল্পচিন্তার এক পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাস।
সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত এবং SVF Entertainment ও DCM প্রযোজিত এই ছবি শুরু থেকেই আলাদা করে নজর কাড়ছিল তার বিষয়বস্তুর জন্য। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জীবন, ভাবধারা ও প্রভাবকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় আখ্যান নয়, বরং সময়ের সঙ্গে বিশ্বাস ও শিল্পের বিবর্তনের এক গভীর অনুসন্ধান।
ট্রেলার প্রকাশের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেল, ‘লহো গৌরাঙ্গের নাম রে’ একটি বহুস্তরীয় সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা। এখানে ইতিহাস, থিয়েটার এবং বর্তমান সময়ের সিনেমা—তিনটি ভিন্ন সময়রেখা একে অপরের সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত। বিশ্বাস কীভাবে যুগে যুগে নতুন ব্যাখ্যা পায়, আর শিল্প কীভাবে সেই বিশ্বাসকে নতুন ভাষা দেয়—এই প্রশ্নগুলিই ছবির মূল সুর।
ট্রেলার লঞ্চ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিচালক সৃজিত মুখার্জি, প্রযোজক রানা সরকার, ছবির শিল্পী ও সংগীতশিল্পীরা। সংগীত পরিবেশনা, স্মৃতিময় মুহূর্ত এবং আবেগঘন কথাবার্তায় ভরা এই সন্ধ্যা কার্যত ছবির ভাবনাকেই প্রতিফলিত করল।
তিন সময়রেখায় বিস্তৃত আখ্যান: বিশ্বাসের পুনর্নির্মাণ

ট্রেলারটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হল এর কাঠামো। এটি একটিমাত্র সময় বা চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তিনটি ভিন্ন সময়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আখ্যান। প্রথম স্তরে রয়েছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের যুগ—ভক্তি আন্দোলনের উন্মেষ, কীর্তন, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের দর্শন।
দ্বিতীয় স্তর দর্শককে নিয়ে যায় ঊনবিংশ শতকের বঙ্গরঙ্গমঞ্চে। বিনোদিনী দাসী ও গিরিশ ঘোষের সময়কাল, যেখানে থিয়েটার হয়ে ওঠে সমাজ, ধর্ম ও ব্যক্তিগত লড়াইয়ের প্রতিফলন। এখানে মহাপ্রভুর কাহিনি নতুনভাবে মঞ্চস্থ হয়, অভিনয় আর বিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
তৃতীয় স্তর বর্তমান সময়। এখানে রাই নামের এক চলচ্চিত্রকারকে দেখা যায়, যিনি মহাপ্রভুর জীবন নিয়ে ছবি বানাতে চাইছেন। এই স্তরটি সবচেয়ে সমসাময়িক প্রশ্ন তোলে—আজকের দিনে বিশ্বাস মানে কী? ইতিহাসকে আমরা কীভাবে পুনর্নির্মাণ করি? সত্য আর ব্যাখ্যার সীমারেখা কোথায়?
এই তিন সময়রেখা মিলেই ট্রেলারটিকে একটি দার্শনিক গভীরতা দেয়, যা সাধারণ বায়োপিক বা পিরিয়ড ফিল্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
শক্তিশালী অভিনয় ও চরিত্রের বহুমাত্রিকতা
এই বহুমাত্রিক গল্পকে ধারণ করার জন্য প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী অভিনয়। ট্রেলার দেখেই বোঝা যায়, সেই জায়গায় কোনও আপস করা হয়নি। দিব্যজ্যোতি দত্ত, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, ঈশা সাহা, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, ব্রাত্য বসু, অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরাত্রিকা মাইতি ও অলকানন্দা গুহ—এই সমৃদ্ধ শিল্পীসম্ভার ছবির অন্যতম বড় শক্তি।
ট্রেলারটিতে প্রত্যেক অভিনেতারই স্বতন্ত্র উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কখনও ঐতিহাসিক চরিত্রের গাম্ভীর্য, কখনও থিয়েটারের নাটকীয়তা, আবার কখনও সমসাময়িক মানুষের দ্বন্দ্ব—এই নানা আবহে অভিনেতারা সাবলীলভাবে নিজ নিজ জায়গা তৈরি করেছেন।


বিশেষ করে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় ও ঈশা সাহার চরিত্রগুলি ট্রেলারে ইঙ্গিত দেয় এক গভীর আবেগী যাত্রার। অন্যদিকে, ব্রাত্য বসু ও ইন্দ্রনীল সেনগুপ্তের উপস্থিতি ছবিতে বৌদ্ধিক ও দার্শনিক স্তরকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলেই মনে হচ্ছে।
এই ensemble cast-এর সমন্বয় ছবিটিকে শুধুমাত্র একটি গল্প নয়, বরং এক সম্মিলিত শিল্পপ্রয়াসে পরিণত করেছে।
সংগীত ও ট্রেলার লঞ্চ: আবেগের কেন্দ্রবিন্দু


‘লহো গৌরাঙ্গের নাম রে’-র অন্যতম প্রধান স্তম্ভ তার সংগীত। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের সুরে তৈরি এই ছবির অ্যালবামে রয়েছে ১৫টিরও বেশি গান। কবীর সুমন, অরিজিৎ সিং, শ্রেয়া ঘোষাল, জয়তী চক্রবর্তী ও পদ্ম পলাশ—ভারতীয় সংগীতজগতের এই কিংবদন্তি কণ্ঠগুলি ছবির সংগীতভাষাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ট্রেলারটি শুরু হয় অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠে এক গভীর ভক্তিমূলক আবহে। সেই প্রথম সুরেই দর্শক প্রবেশ করে ছবির ভাবজগতে—নীরবতা, আত্মসমীক্ষা ও বিশ্বাসের অনুভবে ভরা এক জগৎ।

ট্রেলার লঞ্চ অনুষ্ঠানে এই সংগীতই হয়ে ওঠে সন্ধ্যার প্রাণকেন্দ্র। পদ্ম পলাশ ও জয়তী চক্রবর্তীর লাইভ পারফরম্যান্স অনুষ্ঠানে এনে দেয় এক অন্তরঙ্গ আবহ। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কবীর সুমনের উপস্থিতি এবং তাঁর গাওয়া কয়েকটি লাইন মুহূর্তটিকে করে তোলে স্মরণীয় ও গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
রানা সরকার ও সৃজিত মুখার্জির বক্তব্যেও উঠে আসে ছবির দীর্ঘ যাত্রাপথ এবং দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা। সব মিলিয়ে ট্রেলার লঞ্চটি যেন ছবির ভাবনারই এক জীবন্ত প্রতিফলন।
অফিসিয়াল ট্রেলার প্রকাশের মাধ্যমে ‘লহো গৌরাঙ্গের নাম রে’ এখন তার শেষ পর্বের যাত্রায়। এটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়—বিশ্বাস, শিল্প ও সময়ের মধ্যে চলমান সংলাপ। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জীবন থেকে শুরু করে আধুনিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রশ্ন—সবকিছু মিলিয়ে এই ছবি দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, বড়দিনে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগে ট্রেলারই জানিয়ে দিল—বাংলা সিনেমা আরও একবার প্রস্তুত এক গভীর, সাহসী ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতার জন্য।






