কলকাতার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে শ্যামাসঙ্গীত। মা কালীর আরাধনা, ভক্তির সুর এবং বাংলার নিজস্ব সংগীতধারাকে কেন্দ্র করে ফের এক বিশেষ সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে শহরের অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় প্রাঙ্গণ লেক কালীবাড়িতে। সাধক বামাখ্যাপা ছবির পক্ষ থেকে এবং লেক কালীবাড়ির সেবায়েত শ্রী নিতাই চন্দ্র বসু মহাশয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত এই বিশেষ শ্যামাসঙ্গীতের আসর ঘিরে তৈরি হয়েছিল সাংস্কৃতিক আবহ।
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫টা থেকে লেক কালীবাড়ি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছেএই বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান। মায়ের আরাধনায় শ্যামাসঙ্গীতের সুরে এক সুন্দর সন্ধ্যা কাটানোর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল সংগীতপ্রেমী ও ভক্তদের। ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি বাংলা সংগীত ও চলচ্চিত্রের শিল্পীদের একত্রিত করার উদ্যোগও এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও সুরকার ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, মনোময় ভট্টাচার্য, জয়তী চক্রবর্তী, পার্থসারথি একলব্য, সত্যজিত দেব রায় এবং অতনু মিশ্রের। পাশাপাশি, সাধক বামাখ্যাপা ছবির কলাকুশলীদের উপস্থিতিও এই সন্ধ্যার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
মা কালীর বন্দনা, শ্যামাসঙ্গীত এবং শিল্পীদের সঙ্গে আলাপচারিতা—সব মিলিয়ে লেক কালীবাড়ির এই আয়োজনকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ সাংস্কৃতিক আবহ।
লেক কালীবাড়িতে ভক্তি ও সংগীতের মেলবন্ধন
কলকাতার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে লেক কালীবাড়ির একটি পরিচিত স্থান রয়েছে। মায়ের আরাধনাকে কেন্দ্র করে এখানে বিভিন্ন সময়ে ভক্তিমূলক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিবেশ তৈরি হয়। সেই ধারাতেই শ্যামাসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ সন্ধ্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
শ্যামাসঙ্গীত বাংলা সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। রামপ্রসাদী গান থেকে কমলাকান্তের পদ—মা কালীর প্রতি ভক্তি, অভিমান, আত্মসমর্পণ এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতি এই সংগীতধারার মূল বৈশিষ্ট্য। কখনও মায়ের কাছে সন্তানের আকুল আবেদন, কখনও আবার জীবনের দুঃখ-কষ্টের মধ্যে আশ্রয় খোঁজার অনুভূতি ফুটে ওঠে এই গানগুলিতে।
লেক কালীবাড়ির মতো ধর্মীয় প্রাঙ্গণে শ্যামাসঙ্গীতের আয়োজন তাই কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলার শাক্ত ঐতিহ্য ও সংগীতচর্চাকে নতুন করে উদযাপনের একটি উদ্যোগ।
এক মঞ্চে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, মনোময় ও জয়তী চক্রবর্তী
এই অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল একাধিক পরিচিত সংগীতশিল্পী ও সুরকারের উপস্থিতি। আমন্ত্রিত শিল্পীদের তালিকায় ছিলেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, মনোময় ভট্টাচার্য, জয়তী চক্রবর্তী, পার্থসারথি একলব্য, সত্যজিত দেব রায় এবং অতনু মিশ্র।
বাংলা সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পীদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। বিশেষ করে শ্যামাসঙ্গীতের মতো আবেগনির্ভর সংগীতধারায় শিল্পীদের পরিবেশনা শ্রোতাদের কাছে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
বাংলার সংগীত ঐতিহ্যে ভক্তিমূলক গানের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আধুনিক সংগীতের নানা ধারার মধ্যেও শ্যামাসঙ্গীতের আবেদন আজও অটুট। রেডিও, টেলিভিশন থেকে শুরু করে মঞ্চানুষ্ঠান—বিভিন্ন মাধ্যমে এই গান নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
এই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা ভক্তিমূলক সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হন, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও বাংলা সংগীতের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
সাধক বামাখ্যাপা ছবির কলাকুশলীদের উপস্থিতিও বিশেষ আকর্ষণ
শ্যামাসঙ্গীতের এই বিশেষ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল আসন্ন বা সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র ‘সাধক বামাখ্যাপা’-র পক্ষও। অনুষ্ঠানে ছবির কলাকুশলীদের মধ্যে উপস্থিত থাকার কথা ছিল অভিনেতা সব্যসাচী চৌধুরী, অভিনেত্রী পায়েল দে এবং পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের।
বাংলার আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে সাধক বামাখ্যাপার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারাপীঠের সঙ্গে তাঁর নাম ও সাধনজীবন গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। মা তারার প্রতি তাঁর ভক্তি, সাধনা এবং আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ আজও অটুট।
সাধক বামাখ্যাপাকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রের শিল্পীদের এমন একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার উদ্যোগ বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছিল। এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র, বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং সংগীতের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করার সুযোগ রয়েছে।
অনুষ্ঠানে শিল্পীদের সঙ্গে দর্শকদের আলাপচারিতা এবং ছবির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হওয়ারও প্রত্যাশা ছিল। ফলে এটি শুধুমাত্র সংগীতানুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ না থেকে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারত।
বাংলার শাক্ত ঐতিহ্য ও শ্যামাসঙ্গীতের আবেদন
বাংলার সংস্কৃতিতে মা কালীর আরাধনা এবং শ্যামাসঙ্গীতের সম্পর্ক বহু পুরনো। রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো সাধক-কবিদের রচনায় মা কালীর প্রতি ভক্তি এক অনন্য সংগীতধারার জন্ম দিয়েছে। সেই ঐতিহ্য আজও বাংলার ঘরে ঘরে এবং বিভিন্ন মন্দিরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেঁচে রয়েছে।
বর্তমান সময়ে যখন বিনোদনের মাধ্যম ও সংগীতের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন শ্যামাসঙ্গীতের মতো ঐতিহ্যবাহী ধারাকে ঘিরে অনুষ্ঠান আয়োজন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে পুরনো দিনের গান, সাধক-কবিদের রচনা এবং বাংলার ভক্তিমূলক সংগীতচর্চাকে নতুন করে তুলে ধরা সম্ভব।
লেক কালীবাড়ির এই বিশেষ আয়োজনের ভাবনাতেও সেই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ছাপ ছিল। মায়ের বন্দনা, সংগীত এবং শিল্পীদের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানোর সুযোগ—সব মিলিয়ে কলকাতার সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন।
কলকাতার লেক কালীবাড়িতে সাধক বামাখ্যাপা ছবির উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ শ্যামাসঙ্গীতের আসর বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার এক সুন্দর মেলবন্ধনের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, মনোময় ভট্টাচার্য, জয়তী চক্রবর্তী-সহ বিশিষ্ট শিল্পীদের উপস্থিতি এবং সব্যসাচী চৌধুরী, পায়েল দে ও পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের অংশগ্রহণ এই আয়োজনের আকর্ষণ বাড়িয়েছিল। মা কালীর আরাধনায় সংগীত, ভক্তি ও চলচ্চিত্রের মেলবন্ধনই ছিল এই বিশেষ সন্ধ্যার মূল ভাবনা।





