সকাল হোক বা সন্ধ্যা—কলকাতার রাস্তায় নামলেই একটাই প্রশ্ন ঘোরে, এত যানজট কেন? অফিস টাইমে তো বটেই, এখন ছুটির দিনেও বহু এলাকায় গাড়ির চাকা যেন এগোয় কচ্ছপের গতিতে। কয়েক কিলোমিটারের পথ পেরোতেই সময় লেগে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এই যানজট শুধু বিরক্তির কারণ নয়, সরাসরি প্রভাব ফেলছে কর্মজীবন, ব্যবসা, স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বস্তির উপর। অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে, স্কুলবাস দেরি করছে, অফিসের ডেডলাইন ভাঙছে—সব মিলিয়ে শহরের দৈনন্দিন ছন্দটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অনেকে বলেন, “কলকাতা তো চিরকালই জ্যামের শহর।” কিন্তু বাস্তব বলছে, গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ হয়েছে। প্রশ্ন হলো—এটা কি শুধুই গাড়ির সংখ্যা বাড়ার ফল? নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও গভীর ও কাঠামোগত সমস্যা?
এই প্রতিবেদনে আমরা খতিয়ে দেখব, কলকাতার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম বাড়ার আসল কারণগুলো কী, কোথায় প্রশাসনিক ঘাটতি, আর কোন জায়গাগুলোতে শহরবাসীর অভ্যাসও দায়ী।
শহরে গাড়ির সংখ্যা হঠাৎ এত বাড়ছে কেন?

গত এক দশকে কলকাতায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাইকের সংখ্যা ভয়ঙ্করভাবে বেড়েছে। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, সহজ লোন সুবিধা এবং অ্যাপ-ভিত্তিক রাইড পরিষেবার বিস্তারের ফলে রাস্তায় যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে।
সমস্যা হলো, শহরের রাস্তার পরিসর কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি। ব্রিটিশ আমলে তৈরি বহু রাস্তা আজও একই প্রস্থে রয়ে গেছে। অথচ তখনকার তুলনায় এখন রাস্তায় চলাচল করছে কয়েক গুণ বেশি গাড়ি।
আরেকটি বড় কারণ হলো—একটি পরিবারে একাধিক গাড়ির প্রবণতা। আগে যেখানে একটি স্কুটারেই চলত কাজ, আজ সেখানে রয়েছে বাইক, ছোট গাড়ি, আবার কারও ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গাড়িও। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার অতিরিক্ত যান রাস্তায় নামছে।
পাবলিক ট্রান্সপোর্ট থাকলেও বহু মানুষ সেটি এড়িয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন। বাসের অনিয়ম, ভিড়, আরামহীনতা—সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত যানই বেশি “সুবিধাজনক” মনে হচ্ছে অনেকের কাছে। কিন্তু এর মূল্য দিচ্ছে পুরো শহর।
রাস্তার অবকাঠামো ও খোঁড়াখুঁড়ির দুষ্টচক্র


কলকাতার ট্রাফিক জ্যামের আরেকটি বড় কারণ হলো লাগাতার রাস্তা খোঁড়া ও নির্মাণকাজ। মেট্রো সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ, কেবল লাইন, জল ও গ্যাস পাইপলাইন—একই রাস্তা বারবার খোঁড়া হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
সমস্যা এখানেই শেষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হতে দেরি হচ্ছে, বা খোঁড়ার পর রাস্তা আগের মতো ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হচ্ছে না। এর ফলে লেন সংকুচিত হচ্ছে, গাড়ির গতি কমছে, আর তৈরি হচ্ছে বোতল-নেক।
ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস থাকলেও সেগুলোর সংযোগস্থলে পরিকল্পনার অভাব চোখে পড়ে। এক জায়গায় ফ্লাইওভার নামছে সরু রাস্তায়, যেখানে অতিরিক্ত গাড়ির চাপ সামলানোর ক্ষমতা নেই। ফলে যানজট যেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব। এক দপ্তর রাস্তা সারালে, আরেক দপ্তর আবার সেটি খুঁড়ে দিচ্ছে। শহরবাসীর সময়, জ্বালানি ও ধৈর্য—সবই নষ্ট হচ্ছে এই অব্যবস্থাপনায়।
ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও নাগরিক অভ্যাসের ঘাটতি


শুধু অবকাঠামো নয়, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ও নাগরিক আচরণও যানজট বাড়ার জন্য সমানভাবে দায়ী। বহু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আজও আধুনিক স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে হাতে গোনা ট্রাফিক পুলিশকে বিশাল যানচাপ সামলাতে হচ্ছে।
অবৈধ পার্কিং কলকাতার একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। সরু রাস্তায় এক পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখলে স্বাভাবিকভাবেই রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে যায়। তাতে সামান্য গাড়ি বাড়লেই তৈরি হয় জ্যাম।
ফুটপাত দখল করে দোকান, অটো ও টোটোর অনিয়ন্ত্রিত দাঁড়ানো, যাত্রী তোলার জন্য হঠাৎ ব্রেক—সব মিলিয়ে রাস্তার শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ট্রাফিক নিয়ম না মানার প্রবণতা—সিগন্যাল ভাঙা, ইউ-টার্ন, ভুল লেনে চলা।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য হলো, আমরা অনেকেই নিজের সুবিধাটুকু আগে দেখি। পাঁচ মিনিট বাঁচাতে নিয়ম ভাঙলে যে হাজার মানুষের সময় নষ্ট হচ্ছে, সেটা ভাবার সময় নেই। এই মানসিকতা না বদলালে শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়।
কলকাতার ট্রাফিক জ্যাম কোনও একক সমস্যার ফল নয়। এটি গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্বল অবকাঠামো পরিকল্পনা, দীর্ঘস্থায়ী নির্মাণকাজ, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং নাগরিক অসচেতনতার সম্মিলিত পরিণতি।
সমাধানও তাই একমাত্রিক হতে পারে না। উন্নত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম, কঠোর পার্কিং নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন নাগরিক মানসিকতার পরিবর্তন। শহর শুধু প্রশাসনের নয়—এটি আমাদের সবার।
যদি আমরা সময়, শৃঙ্খলা ও সহনশীলতার মূল্য বুঝতে না শিখি, তবে কলকাতার যানজট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?






