কলকাতার সকাল মানেই এক কাপ চা। বাসস্টপ, অফিসপাড়া, স্কুলের সামনে বা পাড়ার মোড়ে—চা ছাড়া দিনের শুরু কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু ২০২৫-এর শেষ দিক থেকে ২০২৬-এর শুরু—এই সময়ে শহরের প্রায় সব পাড়াতেই এক কাপ চায়ের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, কেন?
যে চা একসময় ৫–৭ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন অনেক জায়গায় ১০–১২ টাকা। কোথাও আবার স্পেশাল দুধ-চা বা লেবু-চা পৌঁছে যাচ্ছে ১৫ টাকায়। বিষয়টি শুধু দাম বাড়ার নয়, বরং এর প্রভাব পড়ছে শহরের দৈনন্দিন জীবনে—বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের উপর।
চা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বললে শোনা যাচ্ছে একাধিক কারণ। কাঁচামাল থেকে শুরু করে জ্বালানি, পরিবহন খরচ, এমনকি শ্রমমূল্য—সবকিছুর চাপ এসে পড়ছে ওই ছোট্ট কাপ চায়ের উপর।
এই প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব—কেন কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় চায়ের দাম বাড়ছে, এর পেছনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা কী, আর ভবিষ্যতে এই দাম স্থিতিশীল হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে কি না।
🍃 চা পাতা থেকে দুধ—কাঁচামালের দামে আগুন
চায়ের মূল উপাদান—চা পাতা। গত এক বছরে উত্তরবঙ্গ ও আসামের চা বাগানগুলোতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে চা পাতার পাইকারি দামে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুধের দাম। কলকাতা ও শহরতলিতে দুধের দাম লিটারপ্রতি গড়ে ৫–৭ টাকা বেড়েছে। চায়ের দোকানদারদের জন্য দুধই সবচেয়ে বড় খরচের জায়গা। এক দোকানি জানালেন, “আগে যেখানে দিনে ৪–৫ লিটার দুধ লাগত, এখন সেই দুধেই দিনে ৩০–৪০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।”
চিনির দামও স্থির নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির চাহিদা বাড়ায় এবং দেশীয় উৎপাদনের ওঠানামার কারণে পাইকারি দামে তার প্রভাব পড়েছে। সব মিলিয়ে এক কাপ চায়ের খরচ বাড়ছে ২–৩ টাকা, যা দোকানদারদের পক্ষে নিজের পকেট থেকে বহন করা অসম্ভব।
ফলে বাধ্য হয়েই তাঁরা দাম বাড়াচ্ছেন। না বাড়ালে লাভ তো দূরের কথা, দোকান চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
🔥 গ্যাস, কয়লা ও পরিবহন খরচের চাপ

অনেকেরই ধারণা, চায়ের দাম বাড়ার কারণ শুধু চা পাতা বা দুধ। কিন্তু বাস্তবে জ্বালানি খরচ একটি বড় ফ্যাক্টর। শহরের বেশিরভাগ চায়ের দোকানে এখন এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করা হয়। গত কয়েক মাসে বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
যাঁরা এখনও কয়লা বা কাঠ ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়। কয়লার দাম বেড়েছে, পাশাপাশি পরিবেশ সংক্রান্ত কড়াকড়ির কারণে সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। ফলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে খরচ আরও বাড়ছে।
পরিবহন খরচও এখানে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। চা পাতা, দুধ, চিনি—সবই ট্রাকে বা ভ্যানে করে আসে। ডিজেল-পেট্রলের দামের ওঠানামা সরাসরি এই পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক দোকানি বললেন, “আগে সপ্তাহে একবার মাল আনাতে যা লাগত, এখন তার থেকে ২০–২৫% বেশি খরচ হচ্ছে।”
এই সমস্ত অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত গিয়ে যোগ হচ্ছে চায়ের দামের সঙ্গে।
👥 শ্রমমূল্য, ভাড়া ও নগর জীবনের বাস্তবতা


শহরের চায়ের দোকান মানেই একা একজন দোকানদার—এমন ভাবলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় এখন সহকারী রাখতে হচ্ছে। সকাল ও সন্ধ্যার ভিড় সামলাতে শ্রমিক দরকার, আর শ্রমিকের মজুরি আগের তুলনায় বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দোকান ভাড়া। ফুটপাতের দোকান হলেও অনেক জায়গায় স্থানীয় স্তরে নির্দিষ্ট ফি বা ভাড়া দিতে হয়। শহরের জমির দাম ও বাণিজ্যিক চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খরচও বেড়েছে।
আরেকটি দিক হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। চায়ের দোকানদাররাও শহরেরই বাসিন্দা। তাঁদের সংসার খরচ, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল—সবকিছু বেড়েছে। ফলে তাঁরা আর আগের মতো কম লাভে ব্যবসা চালাতে পারছেন না।
একজন দোকানদার স্পষ্ট বললেন, “আমরাও তো মানুষ। সবকিছুর দাম বাড়লে চায়ের দাম না বাড়িয়ে উপায় কী?”
কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় চায়ের দাম বাড়া কোনও হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। এটি বহু স্তরের অর্থনৈতিক চাপের ফল—কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন, শ্রমমূল্য ও নগর জীবনের খরচ—সব মিলিয়ে।
চা শুধু একটি পানীয় নয়, এটি শহরের সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সেই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে গেলে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা যায় না। আগামী দিনে যদি কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়, তাহলে চায়ের দামও স্থির হতে পারে। তবে আপাতত কলকাতাবাসীকে সকালের সেই এক কাপ চায়ের জন্য একটু বেশি দাম দিতেই হবে।






