কলকাতা বইমেলা মানেই বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক মহোৎসব। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই উৎসবের প্রস্তুতি এবার শুধু সাহিত্য আর সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—নিরাপত্তাই হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।
গত কয়েক বছরে দেশজুড়ে বড় জমায়েত ঘিরে নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা অভিজ্ঞতা প্রশাসনকে আরও সতর্ক করেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এর জন্য নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা পরিকল্পনা। উদ্বোধনের আগেই মিলনমেলা প্রাঙ্গণ ও সংলগ্ন এলাকায় কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে।
আয়োজক সংস্থা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড এবং কলকাতা পুলিশ যৌথভাবে জানিয়েছে, এবছর দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম নির্বিঘ্ন করতে প্রযুক্তি ও মানবশক্তি—দু’দিক থেকেই প্রস্তুতি চূড়ান্ত।
বইয়ের গন্ধে ভরা এই উৎসব যেন কোনওভাবেই অশান্তির ছায়ায় ঢাকা না পড়ে—এই লক্ষ্যেই কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী করা হয়েছে।
বইমেলা প্রাঙ্গণে বহুতল নিরাপত্তা বলয়
কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এর মূল ভেন্যু মিলনমেলা প্রাঙ্গণকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। প্রবেশপথ থেকে শুরু করে স্টল এলাকা, খাবারের জোন এবং মঞ্চ সংলগ্ন অংশ—সবখানেই থাকবে আলাদা আলাদা নজরদারি।
প্রতিটি প্রবেশপথে বসানো হয়েছে মেটাল ডিটেক্টর গেট ও হ্যান্ড-হেল্ড স্ক্যানার। বড় ব্যাগ নিয়ে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যাতে কোনওভাবেই সন্দেহজনক বস্তু ভিতরে ঢুকতে না পারে। নিরাপত্তা কর্মীদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা পুলিশের একাধিক ইউনিট—ইউনিফর্মধারী পুলিশ, সিভিক ভলান্টিয়ার এবং সাদা পোশাকের গোয়েন্দা—মাঠে নামছে একযোগে। ভিড়ের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা বা চুরি-ছিনতাই রুখতে সাদা পোশাকের পুলিশ বিশেষ ভূমিকা নেবে।
আয়োজকদের মতে, নিরাপত্তা বলয় এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা নিরাপদ বোধ করেন, আবার বইমেলার স্বাভাবিক আনন্দেও কোনও বিঘ্ন না ঘটে।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও কন্ট্রোল রুম


এবারের বইমেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তির ব্যবহারে। মিলনমেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে বসানো হয়েছে শতাধিক হাই-রেজোলিউশন সিসিটিভি ক্যামেরা। এই ক্যামেরাগুলি সরাসরি যুক্ত থাকবে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে।
কন্ট্রোল রুম থেকে রিয়েল-টাইমে ভিড়ের গতিবিধি, প্রবেশ ও প্রস্থানের চাপ এবং সন্দেহজনক আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে মাঠে থাকা পুলিশ টিমকে জানানো হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় জমায়েতে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ভিড় নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। হঠাৎ ভিড় বেড়ে গেলে বা কোনও জায়গায় চাপ সৃষ্টি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
এছাড়াও ড্রোন ক্যামেরার ব্যবহারের কথাও ভাবা হয়েছে, বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে ভিড়ের সামগ্রিক চিত্র পেতে। যদিও ড্রোন ব্যবহারে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বিধিনিষেধ মানা হবে বলে জানানো হয়েছে।
জরুরি পরিষেবা ও দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা


নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—স্বাস্থ্য ও জরুরি পরিষেবাও কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাঙ্গণের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হচ্ছে মেডিক্যাল ক্যাম্প, যেখানে থাকবেন চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা।
হঠাৎ অসুস্থতা, ক্লান্তি বা ছোটখাটো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাতে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা। পাশাপাশি একাধিক অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ডবাই থাকবে, প্রয়োজনে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
বয়স্ক দর্শক, শিশু ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য আলাদা সহায়তা ডেস্ক খোলা হবে। হারিয়ে যাওয়া শিশু বা পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে সাহায্য করবে বিশেষ হেল্পডেস্ক ও ঘোষণার ব্যবস্থা।
আয়োজকরা দর্শনার্থীদের অনুরোধ করেছেন—ভিড়ের সময় ধৈর্য বজায় রাখতে, সন্দেহজনক কিছু দেখলে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মীদের জানাতে এবং বইমেলার নিয়ম মেনে চলতে।
কলকাতা বইমেলা ২০২৬ শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক। সেই ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখতে এবছর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ফাঁক রাখা হচ্ছে না। কড়া পুলিশি নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তি ও মানবিক সহায়তার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে এক নিরাপদ বইমেলা অভিজ্ঞতা।
নিরাপত্তা যতই কঠোর হোক, লক্ষ্য একটাই—যাতে পাঠক, লেখক ও প্রকাশকরা নিশ্চিন্তে এই সাহিত্য উৎসব উপভোগ করতে পারেন। সব প্রস্তুতি মিলিয়ে বলা যায়, কলকাতা বইমেলা ২০২৬ শুধু বইয়ের নয়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে চলেছে।






