কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তের অভিজাত এলাকা বেলিগঞ্জ—যেখানে বারবার পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা যেন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফের একবার পানীয় জলের পাইপলাইনে ফাটল, জলমগ্ন রাস্তা, যানজট আর ক্ষতিগ্রস্ত পিচ—সব মিলিয়ে চাপে পড়েছে কলকাতা পুরসভা (KMC)।
এই ঘটনায় শুধু নাগরিক ভোগান্তিই নয়, প্রশ্ন উঠছে পুরনো পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণ, অস্থায়ী মেরামতি আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং বারবার ঘটতে থাকা এক চেনা সমস্যা।
ভোরের দিকে আচমকাই রাস্তার নীচে থাকা প্রধান জলবাহী পাইপে ফাটল ধরায় প্রবল জলের চাপে উপরে উঠে আসে কাদা ও জল। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তার একটি বড় অংশ বসে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পিচ ও সাব-বেস।
এই ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় KMC-র ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। সাময়িকভাবে জল সরবরাহ বন্ধ করে মেরামতির কাজ শুরু হলেও, এলাকাবাসীর একাংশের প্রশ্ন—এই ‘তাৎক্ষণিক সমাধান’ কি আদৌ দীর্ঘস্থায়ী?
বেলিগঞ্জে বারবার পাইপ ফাটল: পুরনো সমস্যা, নতুন বিপদ
বেলিগঞ্জ অঞ্চলে পানীয় জলের পাইপ ফাটার ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে একাধিকবার একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে, কখনও প্রধান রাস্তার মাঝখানে, কখনও গলিপথে। প্রতিবারই সাময়িক মেরামত, পিচ ঢালাই, আর কয়েক মাস পর ফের একই চিত্র।
পুরসভা সূত্রে জানা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পাইপলাইনটির বয়স কয়েক দশকের বেশি। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চাপ, পুরনো লোহার পাইপে ক্ষয়, এবং আশেপাশে একাধিক নির্মাণকাজ—সব মিলিয়ে এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সমস্যা সম্পর্কে একাধিকবার জানানো হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিবারই সাধারণ মানুষকে ভুগতে হচ্ছে—জল সরবরাহ বন্ধ, যান চলাচল ব্যাহত, দোকানপাট ও অফিসে পৌঁছতে দেরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পাইপ বদল নয়, গোটা নেটওয়ার্কের হাইড্রোলিক চাপ বিশ্লেষণ ও আধুনিক সেন্সর-ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা প্রয়োজন। নাহলে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোখা কঠিন।
ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও যানজট: নাগরিক ভোগান্তি চরমে

পাইপ ফাটার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেলিগঞ্জের ব্যস্ত রাস্তায়। জল জমে রাস্তার পিচ উঠে যাওয়ায় যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে কয়েক ঘণ্টা। অফিস টাইমে এই ঘটনা হওয়ায় সমস্যার মাত্রা আরও বেড়েছে।
বাস, অটো, ট্যাক্সি ঘুরপথে চলতে বাধ্য হওয়ায় আশেপাশের এলাকাতেও তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। স্কুলপড়ুয়া থেকে শুরু করে অফিসযাত্রী—সবাই পড়েন দুর্ভোগে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় আগাম সতর্কতা বা বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না।
রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভবিষ্যতেও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল উপরের পিচ সারিয়ে দিলে হবে না। রাস্তার নীচের স্তর দুর্বল হয়ে গেলে ভারী যান চলাচলে আবার ধস নামতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত ব্যারিকেড বা আলো না থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।
KMC-এর প্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্ন

কলকাতা পুরসভা জানিয়েছে, দ্রুত জল সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং রাস্তা মেরামতই এখন অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট পাইপের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বদলানো হচ্ছে এবং রাস্তার পিচ নতুন করে ঢালাই করা হবে।
তবে নাগরিকদের একাংশের দাবি, এই ধরনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—যার মধ্যে পুরনো পাইপলাইন বদল, আধুনিক উপকরণ ব্যবহার এবং নিয়মিত অডিট অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কলকাতার মতো পুরনো শহরে ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামোর মানচিত্র আপডেট করা অত্যন্ত জরুরি। একাধিক সংস্থা একই জায়গায় কাজ করায় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। সমন্বয়ের অভাব বড় সমস্যা।
এই ঘটনার পর ফের একবার প্রশ্ন উঠেছে—KMC কি শুধুই ‘আগুন নেভানোর’ কাজ করবে, নাকি ভবিষ্যতের কথা ভেবে কঠিন সিদ্ধান্ত নেবে? বেলিগঞ্জের ঘটনা হয়তো সেই পরীক্ষারই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
বেলিগঞ্জে ফের পাইপ ফাটল শুধু একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং শহরের পরিকাঠামোগত দুর্বলতার প্রতীক। বারবার একই সমস্যা ফিরে আসা মানে, কোথাও না কোথাও পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
নাগরিক স্বার্থে এখনই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং আধুনিকীকরণ। নাহলে কলকাতার অন্যান্য এলাকাতেও এমন দৃশ্য দেখা অস্বাভাবিক হবে না। প্রশ্ন একটাই—এই অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা নেবে পুরসভা?






