বলিউডে বড় বাজেটের রোমান্টিক-কমেডি এখন আর আগের মতো ‘ঝুঁকির প্রকল্প’ নয়—অন্তত করণ জোহরের নতুন হিসাব সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। কার্তিক আরিয়ানকে নিয়ে নির্মীয়মাণ ১৭০ কোটি রুপির রোম-কম ছবিটি বক্স অফিসে কেমন পারফর্ম করবে, তা নিয়ে বিশ্লেষণকারীরা যেমন উৎসাহী, তেমনই চমকে গেছেন প্রি-রিলিজ বিজনেস দেখে।
শিল্প সূত্র জানাচ্ছে, ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই করণ জোহরের ধর্মা প্রোডাকশনস প্রায় ৯০ কোটি রুপি উদ্ধার করে ফেলেছে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এটি শুধু সাহসী পদক্ষেপ নয়—বলিউডে পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতিরও প্রতিচ্ছবি।
ওটিটি রাইটস, স্যাটেলাইট ডিল, মিউজিক রাইটস—সব মিলিয়ে নির্মাতারা এমনভাবে রাজস্বের রাস্তা খুলেছেন যে ছবিটি মুক্তির আগেই মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক ‘রিকভার’ হয়ে গেছে। এর অর্থ—বাণিজ্যিক চাপ অনেকটাই কমে গিয়েছে, ফলে ছবিটি নিয়ে ঝুঁকিমুক্ত এবং সৃজনশীল দিকেও সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে।
প্রযোজনা জগতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি করণ জোহরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বাজার বিশ্লেষণের কৌশলগত সাফল্য, যা ভবিষ্যতে বড় ছবিগুলির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় নজির গড়তে পারে।
করণ জোহরের হিসাবি পদক্ষেপে কীভাবে উঠে গেল ৯০ কোটি?

ছবির শুটিং এখনও পুরোপুরি শেষ না হলেও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তি কার্যত বাজিমাত করেছে নির্মাতাদের। সূত্র অনুযায়ী, ওটিটি রাইটস বিক্রি হয়েছে বিশাল অঙ্কে, যার বড় অংশই ৯০ কোটির রিকভারি নিশ্চিত করেছে।
ওটিটি প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই বড় স্টুডিওগুলি ‘হট কনটেন্ট’ সুরক্ষিত করতে অগ্রিম বিশাল বিনিয়োগ করছে। করণ জোহর সেই ট্রেন্ডকেই ব্যবহার করেছেন নিজের সুবিধায়।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে স্যাটেলাইট রাইটস—হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলি নতুন কনটেন্ট পাওয়ার জন্য আগের তুলনায় আরও আগ্রহী। একটি ১৭০ কোটির রোম-কম, তাও কার্তিক আরিয়ানকে কেন্দ্র করে, বাজারে স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ চাহিদা তৈরি করেছে।
মিউজিক রাইটসও চলচ্চিত্রটির আর্থিক মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করেছে। কার্তিকের ছবির গানে সাধারণত ভালো স্ট্রিমিং এবং রিংটোন পারফরম্যান্স দেখা যায়। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখে একটি বড় মিউজিক লেবেল ইতিমধ্যেই অঙ্ক চূড়ান্ত করেছে বলে জানা যাচ্ছে।
কেন কার্তিক আরিয়ানই প্রযোজকদের ‘সেফ ইনভেস্টমেন্ট’?

পাঁচ বছর আগেও কার্তিক আরিয়ানকে ‘যুবসমাজের তারকা’ বলা হলেও, এখন তিনি প্রযোজকদের কাছে নির্ভরযোগ্য তারকা। বক্স অফিসে তাঁর ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে—মাঝারি বা বড় বাজেট, দুই ক্ষেত্রেই তিনি দর্শক টানতে সক্ষম।
‘ভুল ভুলাইয়া ২’-এর বিশাল সাফল্য তাঁকে স্থায়ীভাবে এ-লিস্টে বসিয়েছে। ওটিটি-পরবর্তী যুগে তাঁর ফ্যানবেস আরও বেড়েছে—টিয়ার-টু ও টিয়ার-থ্রি শহরগুলিতে কার্তিকের জনপ্রিয়তা এখন শীর্ষ পর্যায়ে।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে, কার্তিককে নিয়ে রোম-কম বানালে নির্দিষ্ট এক দর্শকশ্রেণি খুব সহজেই হলমুখী হয়। একদিকে শহুরে রোমান্সের দর্শক, অন্যদিকে হালকা বিনোদনপ্রেমী পরিবারের সদস্যরা—দুটো সেগমেন্টই দীর্ঘদিন ধরে কার্তিকের ছবির প্রতি অনুগত।
উপরন্তু, কার্তিকের সোশ্যাল মিডিয়া রিচ অসাধারণ, যা নির্মাণ পর্যায় থেকেই ছবিটির প্রচারে বাড়তি সুবিধা দেয়। প্রযোজনা সংস্থার কাছে এটি বিনিয়োগের অন্যতম নিরাপদ গন্তব্য।
বড় বাজেটের রোম-কম—বলিউডের বাজারে কি আবার ফিরছে ‘হালকা প্রেমের সিনেমা’?

গত কয়েক বছর ধরে বলিউডে যে পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল—অ্যাকশন, প্যান-ইন্ডিয়া প্রজেক্ট, বায়োপিক—তার মাঝেই রোম-কম ঘরানাটি একপ্রকার পিছিয়ে পড়েছিল। তবে দর্শকরা আবারও ‘হালকা-ফুলকা প্রেমের গল্প’ চাইছেন—বক্স অফিস এবং ওটিটি ট্রেন্ড দু’দিক থেকেই তার প্রমাণ মিলেছে।
২০২৪ থেকে ২০২৫—এই সময়ে বেশ কয়েকটি রোমান্টিক-কমেডি সফল হওয়ায় নির্মাতারা বুঝেছেন, দর্শক এখন জটিল গল্পের সঙ্গে সঙ্গে সহজ, রিলেটেবল বিনোদনও খুঁজছেন।
বিপুল বাজেটের অ্যাকশন ফিল্মে ঝুঁকি বেশি থাকায় প্রযোজকদের একাংশ রোম-কম ঘরানায় ফিরে আসছেন, যেখানে ব্যর্থতার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম এবং পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা বেশি।
এই ছবিটি সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় উদাহরণ—যেখানে বাজেট বড়, তবে কাঠামো বিনোদন-কেন্দ্রিক এবং টার্গেট অডিয়েন্স খুব স্পষ্ট।
করণ জোহরের ১৭০ কোটির রোম-কম প্রজেক্টটি এখনই বলিউডে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মুক্তির আগেই ৯০ কোটি রুপি উদ্ধার—এই কৌশলগত সাফল্য শুধু নির্মাতাদের ব্যবসায়িক মেধার পরিচয় নয়, ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বদলে যাওয়া অর্থনীতির প্রতিফলনও।
কার্তিক আরিয়ানের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, বাজারে রোম-কমের নতুন উত্থান, ওটিটি ও স্যাটেলাইট প্ল্যাটফর্মের আগ্রহ—সব মিলিয়ে ছবিটি ইতিমধ্যেই একটি ‘হট প্রপার্টি’। এখন দেখার বিষয়, বক্স অফিসেও কি এই ছবি সেই সাফল্য পুনরাবৃত্তি করতে পারে? বলিউডের চোখ এখন সেই দিকেই।






