উৎসবের আনন্দে যাতে পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সেই লক্ষ্যেই কালীপুজো, দীপাবলি ও ছটপুজো ২০২৬ উপলক্ষে একাধিক কঠোর নির্দেশিকা জারি করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাজি পোড়ানোর সময়সীমা, সবুজ বাজির ব্যবহার এবং বেআইনি বাজির উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উৎসবের দিনগুলিতে পরিবেশবান্ধব উদযাপনের জন্য সাধারণ মানুষ, পুজো কমিটি, আবাসিক সমিতি, বাজি ব্যবসায়ী এবং প্রশাসনের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানানো হয়েছে।
নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে, উৎসবের আনন্দ যেন হাসপাতালের রোগী, প্রবীণ নাগরিক, শিশু এবং শব্দদূষণে সংবেদনশীল মানুষের অসুবিধার কারণ না হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে আইন মেনে বাজি পোড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য—কালীপুজো ও দীপাবলির ঐতিহ্য বজায় রেখেই দূষণমুক্ত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব উৎসব নিশ্চিত করা।
কালীপুজো ও দীপাবলিতে বাজি পোড়ানোর সময়সীমা নির্দিষ্ট
নির্দেশিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাজি পোড়ানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা। পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কালীপুজো ও দীপাবলির দিন রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মাত্র দুই ঘণ্টা বাজি পোড়ানো যাবে।
অন্যদিকে, ছটপুজোর ক্ষেত্রে সকাল ৬টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত বাজি পোড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ছটপুজোর দিনও নির্দিষ্ট দুই ঘণ্টার বাইরে বাজি পোড়ানো যাবে না।
প্রশাসনের নির্দেশ, নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে বাজি পোড়ানো কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ফলে উৎসবের প্রস্তুতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এই সময়সূচি সম্পর্কে সচেতন থাকার আবেদন জানানো হয়েছে।
এই বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য হল উৎসবের সময় অতিরিক্ত শব্দ ও ধোঁয়ার কারণে পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ে, তা কমানো।
শুধুমাত্র অনুমোদিত সবুজ বাজি ব্যবহারের নির্দেশ
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কালীপুজো, দীপাবলি ও ছটপুজোয় শুধুমাত্র অনুমোদিত পরিবেশবান্ধব সবুজ বাজি ব্যবহার করা যাবে। সাধারণ বা নিষিদ্ধ বাজির ব্যবহার, বিক্রি, ক্রয়, আমদানি এবং মজুতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট, কলকাতা হাইকোর্ট এবং জাতীয় পরিবেশ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে এই নিয়ম কার্যকর করার কথা জানিয়েছে রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ও প্রত্যয়িত সবুজ বাজি ছাড়া অন্য কোনও বাজির ব্যবহার বরদাস্ত করা হবে না।
শুধু বাজি পোড়ানো নয়, বাজির উৎপাদন, বিপণন, ক্রয়-বিক্রয় এবং মজুতের ক্ষেত্রেও নজরদারি চালানো হবে। বেআইনি বাজির উৎপাদন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
অর্থাৎ, দোকানে বাজি কেনার সময়ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। অনুমোদিত সবুজ বাজি কি না, তা যাচাই না করে কোনও বাজি কেনা বা ব্যবহার করা উচিত নয়।
শব্দদূষণের নির্দিষ্ট সীমা, হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রমের কাছে বাজি নিষিদ্ধ
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেও একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শব্দ উৎপন্নকারী বাজির ক্ষেত্রে ১২৫ ডেসিবেল এবং আলো উৎপন্নকারী বাজির ক্ষেত্রে ৯০ ডেসিবেলের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং বৃদ্ধাশ্রমের ১০০ মিটারের মধ্যে বাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অসুস্থ ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক, শিশু এবং শব্দের প্রতি সংবেদনশীল মানুষের কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
উৎসবের আনন্দে অনেক সময় শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। কিন্তু অতিরিক্ত শব্দ যে অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি করতে পারে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
বিশেষ করে হাসপাতাল ও নার্সিংহোমের আশপাশে রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাই সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ও পুজো উদ্যোক্তাদেরও এই নিয়ম মেনে চলার আবেদন জানানো হয়েছে।
স্কাই ল্যান্টার্ন ও বেলুন ওড়ানোয় সতর্কতা, বেআইনি কার্যকলাপে নজরদারি
বাজি ছাড়াও আকাশপ্রদীপ বা স্কাই ল্যান্টার্ন এবং বায়ুবেলুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যথাযথ লাইসেন্স বা অনুমতি ছাড়া আকাশপ্রদীপ কিংবা বায়ুবেলুন ওড়ানো বেআইনি বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা এবং পরিবেশগত বিপদের সম্ভাবনা এড়াতেই এই নির্দেশ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। উৎসবের সময় কোনও ধরনের অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ যাতে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি না করে, সেদিকেও প্রশাসনকে নজর রাখতে বলা হয়েছে।
এছাড়াও বাজির বাজার বসানোর ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকা থেকে দূরে এবং অগ্নিনিরাপত্তার বিধি মেনে ব্যবস্থা করতে হবে। বাজি বিক্রির জায়গায় পুলিশি নজরদারি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং বেআইনি বাজি উৎপাদনকারী ইউনিটগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
পুলিশ ও পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে অভিযোগ এবং অনিয়মের উপর নজর রাখা হবে। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৭, ৮ ও ৯ নভেম্বর চালু থাকবে বিশেষ কন্ট্রোল রুম
সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণ এবং নির্দেশিকা কার্যকর করার বিষয়টি নজরে রাখতে বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু রাখছে পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ৭, ৮ ও ৯ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বিধাননগরের পরিবেশ ভবনে এই কন্ট্রোল রুম সক্রিয় থাকবে।
বাজি পোড়ানো সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন, শব্দদূষণ এবং অন্যান্য পরিবেশগত অনিয়মের বিষয়ে সাধারণ মানুষ এখানে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ নম্বর:
- ফোন: ০৩৩-২২০২ ৩০৫৭
- টোল-ফ্রি নম্বর: ১৮০০-৩৪৫-৩৩৯০
রাজ্যের নাগরিক, আবাসিক সমিতি এবং কালীপুজো কমিটিগুলির কাছে পরিবেশবান্ধব উৎসব উদযাপনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। পুজোমণ্ডপ এবং জনসমাগমের জায়গায় পরিবেশ সুরক্ষা সংক্রান্ত সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষ করে শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে সবুজ বাজির ব্যবহার, শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও সকলের
কালীপুজো, দীপাবলি ও ছটপুজো বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসবগুলিকে ঘিরে মানুষের আবেগ, আনন্দ এবং পারিবারিক মিলন বহুদিনের ঐতিহ্য।
তবে উৎসবের আনন্দ যেন অন্যের অসুবিধার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেই বার্তাই দিয়েছে রাজ্য সরকার। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাজি পোড়ানো, অনুমোদিত সবুজ বাজি ব্যবহার, শব্দসীমা মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ এলাকায় বাজি না পোড়ানোর মতো নিয়মগুলি মেনে চলা প্রয়োজন।
প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এবারের উৎসবে তাই শুধু আলোকসজ্জা কিংবা আতশবাজি নয়, পরিবেশ সুরক্ষাকেও উদযাপনের অংশ করে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। আনন্দের উৎসব হোক নিরাপদ, শব্দদূষণমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব।






