স্টেডিয়ামে প্রবেশের আগে স্পষ্ট নির্দেশ—জলের বোতল আনা যাবে না। দর্শকদের উদ্দেশে এই আবেদনই করেছিলেন বিধাননগর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার অনীশ সরকার। তাঁর বক্তব্য ছিল পরিষ্কার: স্টেডিয়ামের ভেতরে পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থা থাকবে, দর্শকদের অসুবিধা হবে না।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ম্যাচ বা অনুষ্ঠান শুরু হতেই বোঝা গেল, জলের ব্যবস্থা সীমিত। আর সেই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই মাথাচাড়া দিল কালোবাজারি। এক বোতল জলের দাম ২০ টাকা থেকে লাফিয়ে পৌঁছল ৬০-৮০ টাকায়।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—জলের কালোবাজারির দায় কার? পুলিশের নির্দেশে বোতল নিষিদ্ধ করা হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ছিল? প্রশাসন, আয়োজক নাকি অনুমোদিত ভেন্ডারদেরই একাংশ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে?
ঘটনার পর প্রশাসনের অন্দরেই শুরু হয়েছে দায় ঠেলার খেলা। ভেন্ডারদের তালিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কে কোথায় দায়িত্বে ছিল, কে কত দামে জল বিক্রি করেছে—সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দর্শকদের ক্ষোভ তাতে আপাতত কমছে না।
জলের বোতল নিষিদ্ধ, প্রতিশ্রুতির ফাঁকফোকর

বড় ম্যাচ বা গণসমাবেশে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জলের বোতল নিষিদ্ধ নতুন কিছু নয়। বিধাননগরের ক্ষেত্রেও সেই যুক্তিই সামনে আনা হয়েছিল। পুলিশের বক্তব্য ছিল, বাইরে থেকে আনা বোতল নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে সেই নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস—স্টেডিয়ামের ভেতরে পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা থাকবে। দর্শকদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হবে না। বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতিই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অনেক দর্শক জানিয়েছেন, একাধিক কাউন্টারে জল শেষ হয়ে গিয়েছিল ম্যাচ শুরুর আগেই। কোথাও আবার জল থাকলেও দাম ছিল অস্বাভাবিক রকম বেশি। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জল না পাওয়া ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা শুধু অব্যবস্থাপনার উদাহরণ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বড় ভিড়ের মধ্যে পানীয় জলের অভাব বিপজ্জনক পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে।
কালোবাজারির অভিযোগ, ভেন্ডারদের দিকে আঙুল

ঘটনার পরই প্রশাসনের একাংশ স্পষ্ট করেছে, জলের কালোবাজারি হলে তার দায় ভেন্ডারদের। অনুমোদিত দামের বাইরে গিয়ে জল বিক্রি করার অনুমতি কারও নেই। সেই কারণে ভেন্ডারদের তালিকা, চুক্তির শর্ত এবং বিক্রির রেকর্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এখানেও রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। ভেন্ডাররা কি একা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নাকি তদারকির অভাবেই এই সুযোগ তৈরি হয়েছে? স্টেডিয়ামের ভেতরে দামের বোর্ড স্পষ্টভাবে টাঙানো ছিল কি না, সে বিষয়েও অভিযোগ উঠছে।
দর্শকদের একাংশ জানিয়েছেন, দাম জানতে চাইলে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। কোথাও বলা হয়েছে ‘ম্যানেজমেন্ট ঠিক করেছে’, কোথাও আবার ‘জল কম আছে’—এই যুক্তি দেখিয়ে বেশি দাম নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতি প্রশাসনের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কারণ, পুলিশি নির্দেশে বোতল নিষিদ্ধ হলে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পাশাপাশি বিকল্প পরিষেবার নজরদারিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দায় এড়ানোর চেষ্টা নাকি শৃঙ্খলার বার্তা?

প্রশাসনিক সূত্রের খবর, পুরো ঘটনার রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। কে কোথায় দায়িত্বে ছিলেন, কোন ভেন্ডার কত স্টল পরিচালনা করেছে, জলের সরবরাহ পরিকল্পনা কী ছিল—সব তথ্য একত্র করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকদের মতে, তদন্তের ঘোষণা দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলা সহজ, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। শুধু ভেন্ডারদের দোষী সাব্যস্ত করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ইভেন্টে পানীয় জল একটি ‘ক্রিটিক্যাল সার্ভিস’। এর জন্য আলাদা মনিটরিং টিম, নির্দিষ্ট দাম এবং পর্যাপ্ত স্টক নিশ্চিত করা জরুরি। নচেৎ প্রতিবারই একই অভিযোগ ফিরে আসবে।
এই ঘটনার জেরে দর্শকদের মধ্যে আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, পরবর্তী ইভেন্টে আবার কি একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে?
জলের মতো মৌলিক প্রয়োজন নিয়ে কালোবাজারি শুধু অনৈতিক নয়, বিপজ্জনকও। বিধাননগরের স্টেডিয়ামে ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখিয়ে দিল, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবের ফাঁক কতটা বড় হতে পারে। ভেন্ডারদের খোঁজ, তদন্ত—সবই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারি। নচেৎ দর্শকদের আস্থা ফেরানো কঠিনই থেকে যাবে।






