টলিউডে তারকা-দম্পতি বলতে যাঁরা বছরের পর বছর আলোর আড়ালে থেকেও আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন, তাঁদের মধ্যে জিৎ ও প্রিয়াঙ্কা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। পর্দার সামনে জিৎ যতটা আকর্ষণীয়, ব্যক্তিজীবনে তিনি ততটাই সংযত—অভিনেতার এই গুণই প্রথম থেকে মুগ্ধ করেছে তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কাকে। ২০০১ সালের সেই প্রথম আলাপ থেকে শুরু করে আজকের সুদীর্ঘ বৈবাহিক পথ—২৩ বছরের সম্পর্ক নিয়ে কোনওদিন প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু বলেননি তাঁরা।
তবে এবার ভুললেন না প্রিয়াঙ্কা। জানালেন, এই দীর্ঘ সময়ে সম্পর্ক এক মুহূর্তের জন্যও ফিকে হয়নি। বরং সময় যত গেছে, বন্ধন ততটাই দৃঢ় হয়েছে। তাঁর কথায়, “জিৎ জানে কী ভাবে বন্ধুত্ব রাখতে হয়।” অর্থাৎ শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেই নয়, তাঁদের বন্ধুত্বই এই জুটির শক্তিশালী ভিত।
টলিউডে যেখানে তারকাদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে নানা জল্পনা, মতান্তর, আলোচনার ঝড় ওঠে, সেখানে জিৎ–প্রিয়াঙ্কার সম্পর্ক বরাবরই স্থিতিশীল। প্রিয়াঙ্কা বলেন, “বন্ধুত্ব যদি পরিষ্কার থাকে, তা হলে কোনও সম্পর্ক ভাঙতে পারে না। আর জিৎ সেই বন্ধুত্বটা আগলে রাখে গভীরভাবে।”
একদিকে জনপ্রিয়তা, ব্যস্ত সময়সূচি, শুটিংয়ের চাপ—সবকিছুর মাঝেও কেমন করে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখেন তাঁরা? প্রিয়াঙ্কার ভাষায়, যোগাযোগই সব। আর সেই যোগাযোগ, সম্মান ও বিশ্বাস—সবটাই তিনি খুঁজে পান জিতের মধ্যে।
২৩ বছরের সম্পর্ক—কীভাবে আরও গভীর হল

২৩ বছরের সম্পর্ক বললে আজকের প্রজন্ম বিস্মিত হয়। সম্পর্কের টানাপোড়েন, ব্যস্ততা, ব্যক্তিগত চাহিদার সংঘাত—সব মিলিয়ে দীর্ঘ সম্পর্ক রক্ষা করা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু জিৎ–প্রিয়াঙ্কা কেন পারেন?
প্রিয়াঙ্কা জানান, তাঁদের সম্পর্কের ভিত্তি কখনও প্রেমে আটকে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’জনের বোঝাপড়া, ধৈর্য, সহনশীলতা আরও দৃঢ় হয়েছে। অভিনেতার স্ত্রী বলেন, “আমাদের মধ্যে এমন কোনও দিন নেই, যেদিন কথা হয়নি। মন খুলে কথা বলার জায়গা—এটাই আমাদের সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রেখেছে।”
শুধু দাম্পত্য নয়, দু’জনের ব্যক্তিজীবনের মূল্যবোধও নাকি একই রকম। পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া, একে অপরের কাজে সমর্থন—এসবই তাঁদের সম্পর্কের অদেখা শক্তি। ছেলের জীবনেও সমানভাবে সময় দেন তাঁরা।
টলিউডের পরিবেশ, আলো, ক্যামেরা, শুটিং—সবসময় সম্পর্কের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন। তবু প্রিয়াঙ্কা মনে করেন, জিরো ইগো স্পেস রাখাই তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম বড় জয়।
তারকার জীবনে ব্যক্তিগত ভারসাম্য—প্রিয়াঙ্কার চোখে জিৎ

তারকা হিসেবে জিতের জনপ্রিয়তা এমনই যে, রাস্তায় বেরোলেই ভিড় জমে যায়। ফ্যানদের আবেগ, প্রযোজকদের চাপ, একের পর এক শুটিং—এই ব্যস্ততার মাঝেও নিজের মানুষদের সময় দেওয়া সহজ নয়। কিন্তু প্রিয়াঙ্কার মতে, জিতের সবচেয়ে বড় গুণ—তারকা-সত্তা আর পারিবারিক সত্তাকে আলাদা করে রাখতে পারা।
তিনি জানান, “বাড়িতে কখনও মনে হয়নি আমি কোনও সেলিব্রিটির সঙ্গে থাকি। জিৎ বাড়িতে পুরোপুরি পরিবারের মানুষ।” কাজের জায়গায় তিনি যতটা মনোযোগী, বাড়িতে ততটাই নিষ্ঠাবান।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—জিতের সংযম। ঝঞ্ঝাট, বিবাদ, চাপ—কিছুতেই সহজে প্রতিক্রিয়া দেখান না তিনি। প্রিয়াঙ্কা বলেন, “ও খুব কম রাগ করে। আর কোনও কথাই রাগের মাথায় বলে না। তাই আমরাও জিনিসগুলো সহজে সামলে ফেলতে পারি।”
টলিউডের বেশ কিছু সম্পর্কের ভাঙন বা দ্বন্দ্বের উদাহরণ আমরা প্রায়ই দেখি। সেখানে জিৎ–প্রিয়াঙ্কার সম্পর্ক ভরসার জায়গা তৈরি করে দেয় নতুন প্রজন্মের কাছে—তা হোক ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা বিবাহিত জীবনের ক্ষেত্রে।
জিৎ জানেন কীভাবে বন্ধুত্ব রাখতে হয়—প্রিয়াঙ্কার বিশেষ মন্তব্য

একটি সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা বলেন, “জিৎ জানে কী ভাবে বন্ধুত্ব রাখতে হয়।” এ বক্তব্য শুধু তাঁদের সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জিতের ব্যক্তিত্বের অন্যতম সেরা বৈশিষ্ট্য এটি।
বন্ধুত্ব মানে আস্থা, সম্মান ও ব্যক্তিত্বকে জায়গা দেওয়া—এই তিনটি বিষয় জিৎ গভীরভাবে বোঝেন বলে দাবি করেন তাঁর স্ত্রী। প্রিয়াঙ্কা বলেন, “ও কাউকে ছোট করে না। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে নিরাপত্তা, শান্তি ও সম্মান।”
শিল্পীসংসারের ব্যস্ততা, গসিপ, পেশাগত প্রতিযোগিতা—এসবের মাঝেও জিতের স্থিরতা ও বন্ধুত্ব ধরে রাখার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। এমনকী টলিউডে তাঁর সহ-অভিনেতা, পরিচালক বা টেকনিশিয়ানরাও একই কথা বলেন—জিতের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত শান্ত, পেশাদার ও বন্ধুসুলভ।
প্রিয়াঙ্কা আরও জানান, “কয়েকটা সময়ে আমাকেই মনে হয়েছে, এত স্ট্রেসের মধ্যেও কীভাবে এতটা নরম, সহজ থাকতে পারে একজন মানুষ! ওর এই গুণটাই ওকে বিশেষ করে।”
টলিউডের ঝলমলে দুনিয়ায় অনেক সম্পর্কই চাপ ও সংকটের মুখে পড়ে। কিন্তু জিৎ ও প্রিয়াঙ্কা দেখিয়ে দিয়েছেন—বিশ্বাস, বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ থাকলে কোনও সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয় না। বরং আরও গভীর হয়।
২৩ বছরের সম্পর্ক তাঁদের কাছে শুধু সময়ের হিসেব নয়; এটি একসঙ্গে পথ চলার গল্প, একে অন্যকে বোঝার অধ্যায়, আর বন্ধুত্বকে সর্বোচ্চ জায়গা দেওয়ার শক্তি। প্রিয়াঙ্কার চোখে জিৎ এক জন দায়িত্বশীল স্বামীই নন, বরং এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধু—যিনি জানেন সম্পর্ককে কীভাবে আগলে রাখতে হয়।
টলিউডের ব্যস্ততার মাঝেও তাঁদের সম্পর্ক তরুণ প্রজন্মকে নতুন বার্তা দেয়—পাশাপাশি হাঁটতে চাইলে সঙ্গীকে বন্ধুর মতো দেখতেই হয়। আর সেই জায়গাতেই জিৎ–প্রিয়াঙ্কার দাম্পত্য হয়ে ওঠে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রেমকাহিনি।






