পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ারিং-আকাঙ্ক্ষী পড়ুয়ার জন্য বড় স্বস্তির খবর। সরস্বতী পুজোর দিনে JEE Main পরীক্ষার সূচি পড়ায় যে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটাল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)। রাজ্যের সাংস্কৃতিক আবেগ ও ছাত্রসমাজের বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষার তারিখ পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরস্বতী পুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাংলার শিক্ষা ও ছাত্রজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এক আবেগের নাম। ঠিক সেই দিনেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষা পড়ায় বহু পরীক্ষার্থী মানসিক চাপ ও দ্বিধার মুখে পড়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে অভিভাবক, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং ছাত্র সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে পরীক্ষার দিন বদলের দাবি জোরালো হয়। সামাজিক মাধ্যমে সেই দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতীয় স্তরেও বিষয়টি আলোচনায় আসে।
অবশেষে NTA পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখে পরীক্ষার সূচি পরিবর্তনের ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে রাজ্যের শিক্ষা মহল।
সরস্বতী পুজো ও পরীক্ষার সূচি: কেন তৈরি হয়েছিল বিতর্ক

সরস্বতী পুজো পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রসমাজের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্কুল, কলেজ ও কোচিং সেন্টার—সব জায়গাতেই এই দিনে পড়াশোনার পাশাপাশি উৎসবের আবহ থাকে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকে, পরিবহণেও প্রভাব পড়ে।
ঠিক এই দিনেই JEE Main পরীক্ষার একটি শিফট নির্ধারিত হওয়ায় সমস্যা শুরু হয়। দূরবর্তী কেন্দ্র, যানজট, পুজো সংক্রান্ত আচার—সব মিলিয়ে পরীক্ষার্থীদের সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়।
অনেক পড়ুয়া জানিয়েছিল, পুজোর আবেগ আর পরীক্ষার চাপ একসঙ্গে সামলানো মানসিকভাবে কঠিন। বিশেষ করে যারা প্রথমবার জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা দিচ্ছে, তাদের জন্য বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—জাতীয় পরীক্ষার সূচি নির্ধারণের সময় কি আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে?
NTA-এর সিদ্ধান্ত ও নতুন পরীক্ষার সূচি

বিতর্ক তীব্র হওয়ার পর NTA পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরীক্ষার্থীদের সুবিধা ও ন্যায্যতার প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না।
নতুন সূচি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের পরীক্ষার্থীদের জন্য সংশ্লিষ্ট শিফট অন্য একটি কার্যদিবসে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার সময়কাল, প্রশ্নপত্রের মান এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি বলে স্পষ্ট করেছে NTA।
এই সিদ্ধান্তে পরীক্ষার্থীদের একদিকে যেমন মানসিক চাপ কমবে, অন্যদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতিও আরও মনোযোগ দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
অনেক অভিভাবকও জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে হলেও এই পরিবর্তন ছাত্রদের প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাবের পরিচয় দেয়।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভারসাম্য: ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা


এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল একাডেমিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন রাজ্যের নিজস্ব সংস্কৃতি, উৎসব ও সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে, যা ছাত্রজীবনের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় স্তরের পরীক্ষার সূচি নির্ধারণের সময় আঞ্চলিক ক্যালেন্ডার ও বড় সাংস্কৃতিক দিনের দিকে আগাম নজর দেওয়া জরুরি। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ছাত্রদের দিক থেকেও সময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব বাড়ছে। পরীক্ষার চাপের মধ্যেও নিজের সংস্কৃতি ও আবেগকে সম্মান করার সুযোগ থাকলে পড়ুয়াদের সামগ্রিক বিকাশ আরও সুস্থ হয়।
এই ভারসাম্যই ভবিষ্যতের শিক্ষা নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে বলে মত শিক্ষা মহলের।
সরস্বতী পুজোর সঙ্গে JEE Main পরীক্ষার সূচি সংঘাতের বিষয়টি প্রথমে উদ্বেগ তৈরি করলেও, শেষ পর্যন্ত NTA-এর সিদ্ধান্ত ছাত্রসমাজে স্বস্তি ফিরিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করল, পরীক্ষার মান বজায় রেখেও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা রক্ষা করা সম্ভব।
ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত আরও আগাম ও পরিকল্পিত হলে জাতীয় পরীক্ষাগুলির প্রতি আস্থা বাড়বে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সহাবস্থানই যে একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি—এই বার্তাই আবার স্পষ্ট হয়ে উঠল।






