বিশ্বায়নের যুগে একটি দেশের পাসপোর্ট শুধু ভ্রমণের নথি নয়—এটি কূটনৈতিক প্রভাব, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন। কোন দেশের নাগরিক কত সহজে বিশ্ব ঘুরতে পারবেন, তার বড় মাপকাঠি হয়ে উঠেছে পাসপোর্টের শক্তি।
সেই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক হেনলি পাসপোর্ট সূচকে ভারতের অবস্থান নতুন করে আলোচনায়। ২০২৫ সালের সর্বশেষ তালিকায় ভারতীয় পাসপোর্ট রয়েছে ৮০তম স্থানে, যেখানে ভিসা ছাড়াই বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় যাওয়া যায় মাত্র ৫৫টি দেশে।
একদিকে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলির অন্যতম, অন্যদিকে পাসপোর্ট র্যাঙ্কিংয়ে এই অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে—ভারতের বৈশ্বিক প্রভাব কি শুধুই অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ? নাকি কূটনীতির ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে?
এই প্রতিবেদনে আমরা বিশদে জানব হেনলি পাসপোর্ট সূচক কী, ভারতের বর্তমান অবস্থানের কারণ, এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা এবং ভবিষ্যতে ভারতীয় পাসপোর্টের শক্তি বাড়ানোর সম্ভাব্য দিকগুলি।
হেনলি পাসপোর্ট সূচক কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

হেনলি পাসপোর্ট সূচক বিশ্বের অন্যতম স্বীকৃত পাসপোর্ট র্যাঙ্কিং ব্যবস্থা। এটি মূলত নির্ধারণ করে কোনও দেশের নাগরিক কতটি দেশে ভিসা ছাড়াই বা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় প্রবেশ করতে পারেন।
এই সূচকটি কোনও দেশের সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক আকার দেখে নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিশ্বাস, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি শক্তিশালী পাসপোর্ট মানে বিশ্ব দরবারে সেই দেশের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
বিশ্বের শীর্ষে থাকা দেশগুলি—যেমন ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র—প্রায় ১৮০টির বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই যাতায়াতের সুবিধা পায়। সেখানে ভারতের মতো বৃহৎ জনসংখ্যার দেশের এই ব্যবধান চোখে পড়ার মতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাসপোর্ট সূচক ভবিষ্যতের বৈদেশিক বিনিয়োগ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। কারণ ভ্রমণ সহজ হলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগও সহজ হয়।
ভারতের ৮০তম স্থান: সংখ্যার আড়ালে বাস্তবতা

বর্তমানে ভারতীয় পাসপোর্টধারীরা ৫৫টি দেশে ভিসা ছাড়াই বা সীমিত প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারেন। এই দেশগুলির মধ্যে বেশিরভাগই এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট দেশ।
ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা বা উন্নত পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের এখনও আগাম ভিসা বাধ্যতামূলক। ফলে পড়াশোনা, ব্যবসা বা স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রেই সময় ও খরচ বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের বিশাল জনসংখ্যা এবং অভিবাসন সংক্রান্ত উদ্বেগ অনেক দেশের ভিসা নীতিতে প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন ও ভিসা ওভারস্টে সংক্রান্ত আশঙ্কাও একটি বড় কারণ।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভিসা সহজীকরণ চুক্তি করেছে। এটি ভবিষ্যতে র্যাঙ্কিং উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।
এশিয়া ও বিশ্বের তুলনায় ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে?

এশিয়ার দিকে তাকালে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি বহু বছর ধরেই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। তাদের নাগরিকরা প্রায় গোটা বিশ্বে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারেন।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে মাঝারি। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের তুলনায় ভারত এগিয়ে থাকলেও, বৈশ্বিক মানদণ্ডে এখনও অনেকটা পিছিয়ে।
এই ব্যবধান শুধু কূটনীতির নয়, বরং অর্থনৈতিক আস্থার সঙ্গেও যুক্ত। যেসব দেশের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সহজ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাদের পাসপোর্টও শক্তিশালী হয়।
ভারতের ক্ষেত্রে বিদেশে দক্ষ কর্মী ও ছাত্রদের সংখ্যা বাড়লেও, নীতিগত স্তরে আরও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং ভিসা রিফর্ম প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতীয় পাসপোর্টের ৮০তম স্থান নিঃসন্দেহে হতাশাজনক, তবে এটি স্থায়ী বাস্তবতা নয়। কূটনৈতিক উদ্যোগ, বৈদেশিক সম্পর্কের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়লে এই অবস্থান বদলানো সম্ভব।
বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা যত বাড়বে, ততই পাসপোর্টের শক্তিও বৃদ্ধি পাবে—এটাই বাস্তব অভিজ্ঞতা। এখন প্রশ্ন একটাই, ভবিষ্যতের ভারত কি সেই কূটনৈতিক বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত?






