ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন—MGNREGA—নতুন এক পরিবর্তনের মুখোমুখি। কেন্দ্রের সাম্প্রতিক সংস্কার উদ্যোগ একদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর দাবি করছে, অন্যদিকে সেই পরিবর্তনই গ্রামবাংলায় কাজের সুযোগ সংকুচিত করছে—এমন অভিযোগ উঠছে বিরোধী দল, শ্রমিক সংগঠন ও সমাজকর্মীদের কাছ থেকে।
গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এই ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পটি বছরে প্রায় ১০ কোটি পরিবারকে কাজের নিশ্চয়তা দেয়। খরা, বন্যা বা অর্থনৈতিক মন্দার সময় এই প্রকল্পই গ্রামীণ ভারতের সেফটি নেট। ফলে এতে সামান্য পরিবর্তনও রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
নতুন ডিজিটাল নীতি, আধার-ভিত্তিক উপস্থিতি, কঠোর তদারকি ও ব্যয়ের কড়াকড়ি—এই সব মিলিয়ে সরকার বলছে, অপচয় ও দুর্নীতি কমানোই লক্ষ্য। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে এর বোঝা পড়ছে দরিদ্র শ্রমিকদের কাঁধে। প্রশ্ন উঠছে—সংস্কার কি সত্যিই দক্ষতার জন্য, না কি ব্যয় সংকোচনের ছুতো?
এই প্রেক্ষাপটে MGNREGA ঘিরে নতুন বিতর্ক কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং এটি গ্রামীণ ভারতের সামাজিক ন্যায় ও জীবিকার অধিকারের প্রশ্নও তুলে ধরছে।
MGNREGA সংস্কারের মূল দিক: কী বদলাচ্ছে প্রকল্পে?


সাম্প্রতিক সংস্কারে MGNREGA-তে একাধিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হল ‘ডিজিটাল হাজিরা’ ব্যবস্থা। স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে শ্রমিকদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করতে হবে—এমন নির্দেশ জারি হয়েছে। সরকারের যুক্তি, এতে ভুয়ো নাম ও জালিয়াতি বন্ধ হবে।
কিন্তু গ্রামবাংলার বাস্তবতা ভিন্ন। বহু এলাকায় এখনও ইন্টারনেট দুর্বল, স্মার্টফোন সবার হাতে নেই। ফলে হাজিরা দিতে না পারলে শ্রমিকদের মজুরি আটকে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে মহিলা শ্রমিক ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রকট।
এছাড়া প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে নতুন কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থা চালু হয়েছে। রাজ্য সরকারের স্বাধীনতা কিছুটা খর্ব হয়েছে বলে দাবি করছে একাধিক রাজ্য। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কাজ শুরু করতেই দেরি হচ্ছে, যা সরাসরি কর্মদিবস কমিয়ে দিচ্ছে।
সরকার অবশ্য বলছে, এই সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পকে আরও শক্তিশালী করবে এবং প্রকৃত উপভোক্তাদেরই সুবিধা দেবে।
সমালোচনার সুর: শ্রমিক ও বিরোধীদের অভিযোগ
MGNREGA সংস্কার নিয়ে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কাজের সুযোগ ও মজুরি প্রদানের প্রশ্ন। শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, ডিজিটাল হাজিরা ও কঠোর নিয়মের ফলে বহু মানুষ কাজ হারাচ্ছেন বা পুরো মজুরি পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস মজুরি বকেয়া থাকছে।
বিরোধী দলগুলির বক্তব্য আরও তীব্র। তাদের মতে, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে ও প্রশাসনিক জটিলতা বাড়িয়ে প্রকল্পটিকে ‘ধীরে ধীরে দুর্বল’ করছে। সংসদে ও রাজ্যসভায় একাধিকবার এই ইস্যুতে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে।
সমালোচকরা আরও বলছেন, MGNREGA কেবল একটি কর্মসংস্থান প্রকল্প নয়—এটি গ্রামীণ ভারতের দরিদ্র মানুষের অধিকার। সেখানে প্রযুক্তি-নির্ভরতা চাপিয়ে দিলে সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়বে। যারা ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই বিতর্কে মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নও উঠে আসছে, যা বিষয়টিকে নিছক প্রশাসনিক সংস্কারের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের অবস্থান: স্বচ্ছতা বনাম ব্যয় নিয়ন্ত্রণ

কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট—MGNREGA-তে সংস্কার মানেই কর্মসংস্থান কমানো নয়। তাদের দাবি, ডিজিটাল নজরদারি ও নতুন নিয়মের মাধ্যমে প্রকল্পে স্বচ্ছতা আসবে, ভুয়ো উপভোক্তা বাদ পড়বে এবং প্রকৃত শ্রমিকরা উপকৃত হবেন।
সরকারের যুক্তি অনুযায়ী, অতীতে প্রকল্পে ব্যাপক অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়বে, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে বলেই তাদের আশা।
তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—স্বচ্ছতার নামে কি মানবিক দিকটি উপেক্ষিত হচ্ছে? গ্রামীণ ভারতের বাস্তব সমস্যাগুলি কি নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
MGNREGA সংস্কার নিয়ে বিতর্ক মূলত দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে—একদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও ডিজিটাল স্বচ্ছতার দাবি, অন্যদিকে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবিকা ও অধিকারের প্রশ্ন। বাস্তবতা হল, এই প্রকল্প গ্রামীণ ভারতের জন্য এখনও অপরিহার্য।
সংস্কার প্রয়োজন—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই সংস্কার যদি মাঠের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে, তবে তার ফল উল্টো হতে পারে। আগামী দিনে সরকার, রাজ্য ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয়ই ঠিক করবে—MGNREGA সত্যিই শক্তিশালী হবে, নাকি বিতর্কের ভারে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।






